নেপালে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও মর্মান্তিক ভূমিধসে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিদেশি পর্যটকসহ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের রক্ষায় পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো চরম পদক্ষেপের চিন্তাভাবনা করছে দেশটির প্রশাসন। সরকারের এই হিমশিম অবস্থায় সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছে-হিমবাহ ধসে নেপালে যে শক্তির সৃষ্টি হয়েছিল, তা ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমাতে ফেলা মার্কিন পরমাণু বোমার চেয়েও বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ছিল।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও খ্যাতনামা গবেষক ড. বসন্ত রাজ অধিকারী এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, হিমালয় অঞ্চলে এটিই ছিল তার দেখা সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। নদীর ওপর সুবিশাল হিমবাহের এক বিরাট অংশ ধসে পড়ায় তা মুহূর্তের মধ্যে গলে গিয়ে তীব্র জলস্রোত তৈরি করে নিম্নাঞ্চলে আঘাত হানে। অনেকটা ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে ঘটা বিপর্যয়ের মতো হলেও নেপালের এই ঘটনার শক্তির মাত্রা ছিল বহু গুণ বেশি।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়াবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দিবাস শ্রেষ্ঠা জানান, লাংটাং উপত্যকার বিখ্যাত লিরুং শৃঙ্গের উত্তর ঢালে অবস্থিত এক ঝুলন্ত হিমবাহ ধসে পড়ার কারণেই মূলত এই মহাবিপর্যয় ঘটে। হিমবাহটির বিশাল খণ্ড প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতা থেকে খাড়া নিচে আছড়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের (USGS) তথ্যে দেখা গেছে, এই ভূমিধসের ফলে ৫.২ মাত্রার ভূকম্পিক সংকেত রেকর্ড করা হয়েছিল, যা কোনো টেকটোনিক প্লেটের কারণে নয়, বরং হিমবাহ আছড়ে পড়ার প্রবল শক্তিতেই উৎপন্ন হয়েছিল।
এদিকে, নেপাল সরকার এই মহাবিপর্যয়ের জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনকেই সরাসরি দায়ী করেছে। নেপালের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান মহেশ্বর ধাকাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে নেপালের ভূমিকা নগণ্য হলেও ধনী দেশের কারণে তাদের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠন করতে অন্তত ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন, যার জন্য জাতিসংঘের কাছে জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে নেপাল।

