উন্নত জীবন, ভালো চাকরি কিংবা সুখী ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে চরম নির্যাতন, প্রতারণা ও শোষণের শিকার হচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি নারী। গত সাত বছরে প্রবাসে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী। এ ছাড়া একই সময়ে প্রায় ৮০০ জন নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসে পৌঁছেছে, যা প্রবাসে নারীদের নিরাপত্তার সংকটময় চিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অভিবাসন সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় প্রতারক দালালদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র বাংলাদেশে তাদের সক্রিয় জালিয়াতি ও প্রতারণা অব্যাহত রেখেছে। চটকদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গ্রামের সরল নারীদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা, ভুয়া বিয়ের ফাঁদে ফেলা কিংবা উচ্চ বেতনের চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হচ্ছে প্রবাসের বিভিন্ন দেশে।
অভিযোগে প্রকাশ, বিদেশি পাচারকারীরা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারীদের পরিবারের সাথে প্রথমে সখ্য গড়ে তোলে। পরবর্তীতে ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে বা বিদেশি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে আইটি ও কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে নিয়ে যায়। প্রবাসে পৌঁছানোর পরপরই ওই নারীদের পাসপোর্ট, অর্থকড়ি কেড়ে নিয়ে কোনো অসাধু ব্যক্তি বা যৌন চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁদের জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়।
ইতোপূর্বে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কম্বোডিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা ভুক্তভোগীদের জবানবন্দিতেও বেরিয়ে এসেছে নির্মম শারীরিক নির্যাতন, না খাইয়ে আটকে রাখা এবং যৌন নিপীড়নের রোমহর্ষক বিবরণ। আন্তর্জাতিক এই পাচার চক্র থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগীরা বর্তমানে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে ভিসা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত পরিচয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা অতি জরুরি। প্রবাসে আটকে পড়া ভুক্তভোগী নারীদের তাৎক্ষণিক আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা পৌঁছানোর পাশাপাশি পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, প্রেম বা চাকরির ফাঁদে নারী পাচার বন্ধে পুলিশ, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এবং অভিবাসন সংস্থাগুলোর একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।

