বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা মার্কিন ধনকুবের ও শিশু যৌন-পাচারের মূলহোতা জেফরি এপস্টেইনের মৃত্যুর পর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর। তবে তার গড়ে তোলা নারকীয় সাম্রাজ্য এবং নারীদের ওপর চালানো অবর্ণনীয় নির্যাতনের নতুন নতুন লোমহর্ষক তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসছে। সম্প্রতি এপস্টেইনের সাবেক এক নারী সহকারী ( ছদ্মনাম ‘আনিয়া’), আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির কাছে এই অর্থব্যবসায়ীর তৈরি করা একটি ভয়ংকর ‘নির্যাতনের ইকোসিস্টেম’ এবং অত্যন্ত জটিল মানসিক ব্ল্যাকমেইলের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন।
কমিউনিস্ট শাসন-পরবর্তী রাশিয়ায় বড় হওয়া আনিয়া মূলত একজন পেশাদার মডেল ছিলেন, যিনি ফেন্ডি ও চ্যানেলের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের হয়ে ইউরোপে কাজ করেছেন। প্যারিসের একটি এজেন্সিতে ড্যানিয়েল সিয়াদ নামের এক মডেল স্কাউটের মাধ্যমে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি এপস্টেইনের জগতে প্রবেশ করেন। আনিয়া এখন অনুশোচনা করে বলেন, সিয়াদ মূলত একজন ‘প্রফেশনাল ট্রাফিকার’ ছিলেন এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। প্রথম সাক্ষাতে এপস্টেইনের ১৮-রুমের প্যারিস অ্যাপার্টমেন্টে বিল ক্লিনটনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের ছবি দেখে তিনি আশ্বস্ত হয়েছিলেন। শুরুতে এপস্টেইন তাকে ‘আমি তোমার সাথে শুতে চাই না’ বলে আশ্বস্ত করলেও, সেটি ছিল মূলত দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত জটিল ‘গ্রুমিং’ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। পরবর্তীতে মডেলিংয়ে ব্যর্থতার ভুয়া আবহ তৈরি করে এবং পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আনিয়াকে ফ্লোরিডার পাম বিচে প্রথমবার যৌন নির্যাতন করেন এপস্টেইন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালে এক কিশোরীকে নির্যাতনের দায়ে প্রথমবার সাজা পাওয়ার পর এপস্টেইন তার কৌশল পরিবর্তন করেন। তিনি মূলত রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের প্রাপ্তবয়স্ক কিন্তু দেখতে কিশোরীদের মতো এমন নারীদের টার্গেট করতে শুরু করেন। ম্যানহাটনের ইস্ট ৬৬ নং স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে আনিয়াসহ প্রায় এক ডজন নারীকে রাখা হয়েছিল, যাদের ঘর ও যৎসামান্য বেতন দেওয়া হলেও ২৪ ঘণ্টা অন-কল থাকতে হতো। এপস্টেইন নিজেকে একটি ‘কাল্ট লিডার’ হিসেবে দাবি করতেন এবং এই নারীদের জীবনের প্রতিটি দিক—অর্থ, সামাজিক যোগাযোগ এবং শরীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এমনকি Anya-র পেটের একটি সাধারণ ট্যাটু দূর করার জন্য লেজার ব্যবহার না করে, চিকিৎসকদের বাধ্য করে তার চামড়া কেটে ফেলার মতো বিকৃত সার্জারিও করিয়েছিলেন এই ধনকুবের।
সহকারীদের কেউ যাতে কোনোদিন পালিয়ে না যায় বা মুখ না খোলে, সেজন্য এপস্টেইন তাদের টপলেস ভিডিও ধারণ করে রাখতেন এবং জোরপূর্বক ‘গ্র্যাটিটিউড লেটার’ বা ধন্যবাদ জ্ঞাপক চিঠি লেখাতেন। একবার এক সহকারী পালিয়ে গেলে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর দিয়ে তাকে খুঁজে বের করা হয় এবং ৭ লক্ষ ডলার পাওনা দাবির একটি ভুয়া ইমেইল দেখিয়ে বাকিদের সতর্ক করা হয় যে—‘চলে গেলে তোমাকেও খুঁজে বের করা হবে’। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল, এই ইকোসিস্টেম সচল রাখতে প্রত্যেক সহকারীকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্য একজন নতুন নারীকে রিক্রুট বা সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হতো। আনিয়া বলেন, “বিল গেটসের মতো বিশ্বনেতারা যখন তার বাড়িতে ডিনার করতে আসতেন, তখন আমরা ভাবতাম এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস আমাদের কোথায়?” ২০১৯ সালে বিচারাধীন অবস্থায় এপস্টেইনের আত্মহননের পর এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পান আনিয়া এবং পরবর্তীতে ‘এপস্টেইন ভিকটিমস কমপেনসেশন ফান্ড’ থেকে ক্ষতিপূরণ পান। তিনি আশা করেন, তার এই স্বীকারোক্তি বর্তমানে কোনো অত্যাচারী সম্পর্কে আটকে থাকা নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাবে।

