হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জলপথে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সোমবারও দুই দেশের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে গত মাসে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকটি এখন গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরের ওপর আবারও নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট ‘ফি’ দিতে হবে। একই সাথে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথের অভিভাবকত্ব নেওয়ার দাবিও করেছেন তিনি। মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সমঝোতা স্মারকের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে ইরানও চুক্তি মানবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জ্বালানিবাহী জাহাজে রহস্যজনক হামলার পর পরিস্থিতি আবার ওলটপালট হয়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পর মার্কিন সেন্টকম ইরানের ড্রোন ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ও উপকূলীয় রাডার লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের খুজেস্তান ও ইসফাহান প্রদেশে অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন। মার্কিন বাহিনী এই অভিযানে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক ‘ওয়ান-ওয়ে সামুদ্রিক ড্রোন’ ব্যবহার করেছে।
পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। ইরানের দাবি অনুযায়ী—কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে সফল আঘাত হানা হয়েছে। এই হামলায় বাহরাইনে একটি মার্কিন ড্রোনবহর ধ্বংস এবং জর্ডানে বড় জ্বালানি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে দুই পরাশক্তির এই মুখোমুখি সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
এর আগে সংকট নিরসনে সুইজারল্যান্ড ও কাতারে দুই দফা আলোচনা হলেও পরবর্তী বৈঠক নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ওমানের সাথে ইরানের কূটনৈতিক আলোচনা মার্কিন চাপের কারণে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে তেহরানে পুনরায় আলোচনা বসতে রাজি হয়েছে ইরান। ভূ-রাজনৈতিক গবেষকেরা মনে করছেন, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে কোনো পক্ষই নিজেদের অনুকূলে পরিস্থিতি নিতে পারবে না। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে দুই দেশকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে; অন্যথায় এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ যুদ্ধ ডেকে আনবে।

