দেশের সামগ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ১০ হাজার ৭৬৪ জন শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, ইংরেজি ভাষার ওপর বিশেষ দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে এগিয়ে থাকার প্রত্যাশাই মূলত অভিভাবকদের এই ধারার শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থী ছিল ৬৮ হাজার ৮২৫ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জনে। অথচ এর বিপরীতে দেশের মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত সামগ্রিক শিক্ষার্থী গত এক বছরেই কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ জন। যেখানে ২০২৪ সালে মোট শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন, ২০২৫ সালে তা কমে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জনে নেমে এসেছে। সামগ্রিক শিক্ষা খাতে শিক্ষার্থী কমার এমন প্রবণতা সত্ত্বেও ইংরেজি মাধ্যমের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বেশ লক্ষণীয়।
শহরকেন্দ্রিক সুযোগ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত: ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার বিস্তার দেশজুড়ে সমানভাবে ঘটেনি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৪৩টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের মধ্যে ১৪১টি বা ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত। উপজেলা সদর বা মফস্বল এলাকায় এ ধরনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অনুপাত ১:১০, অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। এছাড়া শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশে নারীদের আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে মোট ৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৭১ দশমিক ৬৬ শতাংশই নারী শিক্ষক।
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, ইংরেজি মাধ্যমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক্যারিয়ার ও উচ্চশিক্ষার সুবিধা: ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য দক্ষতা অর্জন করে, ফলে দেশ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির বাজারে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।
আইইএলটিএস থেকে অব্যাহতি: অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় বাড়তি ভাষার পরীক্ষা বা অতিরিক্ত কোর্স করার জটিলতা থেকে মুক্ত থাকে।
সাধারণ শিক্ষার প্রতি আস্থার সংকট: শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতির জটিলতা এবং পাঠদানের মান নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক অভিভাবক বিকল্প ধারার এই শিক্ষাকে বেছে নিচ্ছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, কার্যকর প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সামর্থ্যবান পরিবারগুলোর ইংরেজি মাধ্যমের দিকে ঝোঁকার এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।

