প্রধান খবর

‘বাবা আমি বাসায় যাব’-আইসিইউতে বাবার হাত ধরে অনুশ্রীর আকুতি আর শেষ বিদায়

“বাবা, আমি বাসায় যাব”—চিকিৎসকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাবার হাতটি ধরে এটিই ছিল ৭ বছরের নিষ্পাপ শিশু অনুশ্রী দাসের শেষ কথা। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে পাহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা আর বাবার আকুল আকুতিকে ব্যর্থ করে দিয়ে শনিবার বিকেলে চিরবিদায় নেয় শিশুটি।

পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা সুবল চন্দ্র দাস ও লিপি দাস দম্পতির ছোট মেয়ে অনুশ্রী গত ১৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। শুরুর দিকে শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও দিন গড়ানোর সাথে সাথে শিশুটি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খাওয়া-দাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দেয়। শুক্রবার হঠাৎ অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত শিশু আইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।

আইসিইউ বেডের জন্য বাবা সুবল চন্দ্র দাস চট্টগ্রামের একের পর এক হাসপাতালে ছোটাছুটি শুরু করেন। মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, সার্জিস্কোপ ও চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কোনো খালি বেড না পেয়ে শেষপর্যন্ত পাহাড়তলীর ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে মেয়কে ভর্তি করান। শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে আইসিইউতে থাকা মেয়ের কাছে গেলে প্লাটিলেটের মাত্রা ২৩ হাজার ৫০০-তে নেমে আসা অনুশ্রী বাবাকে দেখে বাড়ি ফেরার শেষ আকুতি জানায়।

পরদিন শনিবার সকালে অনুশ্রীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে; ডেঙ্গুর প্রকোপে তার লিভার ও কিডনিও আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। শনিবার বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে বাবা সুবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “আমার অনুশ্রী লাইফ সাপোর্টে।” ঠিক এর দুই ঘণ্টা পর সাড়ে ৫টার দিকে চিকিৎসকরা অনুশ্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার রাতেই সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ মহাশ্মশানে শিশুটির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

মাত্র দুই মাস আগে গত ২ আগস্ট পরিবারের সাথে অনুশ্রীর সপ্তম জন্মদিন উদযাপিত হয়েছিল, যেখানে বাবাকে হাত খাইয়ে দেওয়া এই শিশুই ছিল সুবলের বেঁচে থাকার মূল প্রেরণা। মেয়েকে বাঁচানোর জন্য সুবল চন্দ্র দাস সব ধর্মের মানুষের কাছে প্রার্থনা ও দোয়া চেয়েও শেষপর্যন্ত অনুশ্রীকে রক্ষা করতে পারেননি। অশ্রুসজল চোখে বাবা সুবল বলেন, “আমার মেয়ে চলে গেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য আমি সবকিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারলাম না।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *