ইরানে নারীদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১৫ জন নারী ও কিশোরী নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশের সঙ্গেই নিহতদের স্বামী, ভাই, বাবা কিংবা পরিবারের নিকটতম পুরুষ সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই আঁতকে ওঠার মতো তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও জনক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, তেহরান, ইসফাহান, তাবরিজ, কেরমানশাহ এবং কেশম দ্বীপসহ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহতদের মধ্যে ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরী থেকে শুরু করে প্রবীণ নারীও রয়েছেন। গত ৯ অক্টোবর উত্তর-পূর্ব ইরানের বাখারজ এলাকায় ১৬ বছর বয়সী ইয়েগানেহ হোসেইনজাই নামের এক কিশোরীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাল্যবিয়ে হওয়া এই কিশোরীকে নির্মম শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করার অভিযোগে তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একইভাবে ইসফাহানে ৪০ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী মিনা সোলতানিকে তাঁর স্বামী নিজ বাড়িতে হত্যা করেন। এছাড়া কেশম দ্বীপে কথিত ‘সম্মান রক্ষা’ বা অনার কিলিংয়ের নামে ২৮ বছর বয়সী মরিয়ম ইয়ারমোহাম্মাদিকে তাঁর আপন ভাই প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। সেমনান প্রদেশে পারিবারিক বিরোধের জেরে ১৮ বছরের এক তরুণীকে গুলি করে হত্যা করে তাঁর নিজের ভাই। এমনকি রাজধানীতে ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ স্ত্রীকেও সন্দেহজনক কারণে শ্বাসরোধে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধের জেরে একই পরিবারের একাধিক সন্তানসহ মাকে গুলি করে হত্যা এবং হত্যাকাণ্ডের পর আসামির আত্মহত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, ইরানে নারীদের ওপর পারিবারিক নির্যাতন ও নৃশংসতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ উপযুক্ত আইনি সুরক্ষার অভাব। দেশটিতে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে একটি প্রস্তাবিত আইন দীর্ঘ ১২ বছর ধরে সরকার ও পার্লামেন্টের দ্বন্দ্বে আটকে রয়েছে। কেবল ‘সহিংসতা’ ও ‘অপরাধ’-এর মতো নির্দিষ্ট কিছু শব্দের ব্যবহার এবং আইনি পরিভাষা নিয়ে বিতর্কের অজুহাতে আইনটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ইরানের আইনি কাঠামোয় বাবা বা পিতামহের হাতে সন্তান বা নাতি-নাতনি নিহত হলে ‘কিসাস’ বা সমপরিমাণ শাস্তির বিধান থেকে অব্যাহতির সুযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘হেঙ্গাও’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ইরানে দুই শতাধিক নারী বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে বড় একটি অংশই অনার কিলিং, বিবাহবিচ্ছেদের দাবি কিংবা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জেরে সংঘটিত হয়েছে। সরকারি স্বচ্ছ পরিসংখ্যানের অভাবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনতিবিলম্বে ইরানে বৈষম্যমূলক আইন বাতিল এবং নারীদের সুরক্ষায় কঠোর আইনি কাঠামো বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছে।

