অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রবাসী সম্প্রীতির অনন্য আবহে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ক্যাম্পসির ওরিয়ন ফাংশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই উৎসবটি পরিণত হয় প্রবাসী বাঙালির ধর্মীয় অনুরাগ, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা, গুণীজনের সম্মাননা এবং সামাজিক সংহতির এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
দেবী দুর্গার আরাধনা, অঞ্জলি নিবেদন, প্রসাদ বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের প্রতিটি পর্বে প্রতিফলিত হয়েছে বাঙালির শাশ্বত ঐতিহ্য। প্রবাসের বহুমাত্রিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার যে প্রত্যয় বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে, বিপিএর এবারের আয়োজনেও তারই বলিষ্ঠ প্রতিফলন দেখা গেছে।
এবারের শারদোৎসবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত ‘বিপিএ কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তায় দীর্ঘদিনের অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন সিডনিপ্রবাসী বিশিষ্ট লেখক, কবি, ছড়াকার ও কলামিস্ট অজয় দাশগুপ্ত।
বিপিএ কর্তৃপক্ষের মতে, সমাজে ইতিবাচক অবদান, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার বিকাশ এবং উদার মানবিক মূল্যবোধের লালন ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হয়। ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় তাঁর অবিচল নিষ্ঠা এবং প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের সমকালীন জীবনধারার সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
উৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছে বিপিএর বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাময়িকী ‘অঞ্জলি’র মোড়ক উন্মোচন। ১৩০ পৃষ্ঠার এই মননসমৃদ্ধ সংকলনে স্থান পেয়েছে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান লেখকদের ৩৮টি রচনা। সাময়িকীটির প্রধান সম্পাদক ড. সুবাষ চন্দ্র সাহা এবং সম্পাদক তুষার রায়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এতে কলম ধরেছেন অজয় দাশগুপ্ত, অধ্যাপক ড. অসীম সরকার, ড. তপন বাগচী ও লুৎফর রহমান রিটনসহ বিশিষ্ট সাহিত্যিকেরা। আয়োজকদের মতে, ‘অঞ্জলি’ নিছক কোনো উৎসবস্মারক নয়; বরং প্রবাসে বাংলা ভাষার চর্চা টিকিয়ে রাখা এবং আগামী প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্যবোধ জাগিয়ে তোলার একটি স্থায়ী প্রয়াস।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠানে যোগ দেয় ‘অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ’ (AFERMB)-এর প্রতিনিধিরা। এ পর্বে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নটি জোরালোভাবে উঠে আসে। বিপিএ সভাপতি দিলীপ দত্ত বাংলাদেশের সব সংখ্যালঘুর জীবন, সম্পদ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি চিন্ময় প্রভুর মুক্তির দাবিও উত্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে তুষার রায়ও চিন্ময় প্রভুর কারাবন্দিত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
শারদোৎসবের রেশকে ধরে রাখতে আগামী ১৪ নভেম্বর সিডনির ক্যাম্পসির ওরিয়ন ফাংশন সেন্টারে বর্ণাঢ্য ‘বিজয়া সম্মিলনী’ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য এই মিলনমেলায় সপরিবারে উপস্থিত থাকার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন অমল দত্ত।
সব মিলিয়ে, গুণীজনের সম্মাননা, সাহিত্য প্রকাশনা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবাধিকার সচেতনতার মধ্য দিয়ে বিপিএর এবারের শারদোৎসব প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

