প্রধান খবর

 সিডনিতে জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির নিহতদের স্মরণ

চার দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সেই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক রাতের স্মৃতি আজও মলিন হয়নি। স্বজন হারানোর গভীর বেদনা, প্রত্যক্ষদর্শীদের রোমহর্ষক স্মৃতিচারণ এবং প্রয়াতদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়েছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস’।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সিডনির কিংস ল্যাংলির জিম সাউথি কমিউনিটি সেন্টারে এই স্মরণসভা ও প্রার্থ নানুষ্ঠানের আয়োজন করে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়া (জেএইচএএএ)। অনুষ্ঠানে জগন্নাথ হলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নিহতদের পরিবারের সদস্য ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। স্মৃতিচারণ, শ্রদ্ধা ও প্রজন্মান্তরের দায়বদ্ধতার এই আয়োজন এক আবেগঘন মিলনমেলায় পরিণত হয়।

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হলের ধসে পড়া ভবনের ছাদ ভেঙে ঘটে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা। বহু শিক্ষার্থী, সাধারণ কর্মচারী ও আমন্ত্রিত অতিথি সেদিন প্রাণ হারান। এরপর থেকেই ১৫ অক্টোবরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে আসছে। ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে প্রবাসের মাটিতে আয়োজিত এই সভা প্রমাণ করে, হাজার হাজার মাইল দূরের প্রবাসেও স্মৃতির বন্ধন অটুট রয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গৌতম দাস মিঠু ট্র্যাজেডির বিচারপ্রক্রিয়া ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতিচারণ কেবল অতীতে ফিরে দেখা নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো অবকাঠামোগত ব্যর্থতায় জীবন না যায়-তা নিশ্চিতে সচেতনতা ও ন্যায়বিচারের লড়াই জোরদার করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি কামরুল মান্নান আকাশ সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ভয়াবহ স্মৃতি তুলে ধরেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন ছাত্র মনোরঞ্জন পাল ওই রাতে তাঁর নিজের প্রিয় ভাইকে হারানোর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী কুমার পিয়াল দাস (রজত) হলের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি সার্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্মৃতির দায়বদ্ধতা থেকেই প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ও তাদের ক্যারিয়ার গঠনে কার্যকর অবদান রাখতে হবে।

 অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে ছিল গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ, মোমবাতি প্রজ্বলন, এক মিনিটের নীরবতা পালন, কবিতা আবৃত্তি এবং নিহতদের আলোকচিত্রে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিকতার সার্বজনীন সুর ফুটে ওঠে। সাংস্কৃতিক দিকটি সমন্বয় করেন আকাশ কর এবং সামগ্রিক সার্বিক সহায়তায় ছিলেন তুষার রায় ও নির্মল চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনের সভাপতি কাজল রায়। এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রবাসীরা আরও একবার অঙ্গীকার করেন-ইতিহাসের রক্তাক্ত ও শোকাবহ অধ্যায়গুলো কেবল স্মৃতিতে ধরে রাখাই নয়, বরং বর্তমানের বিবেক ও ভবিষ্যতের জন্য দায়বদ্ধতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *