ঘরে পড়ে রয়েছে চিরবিদায় নেওয়া অর্ধাঙ্গিনীর নিথর দেহ। সেই গভীর শোক বুকে চেপে রেখেও কর্তব্যের খাতিরে পাশের মসজিদে গিয়ে ফজরের আজান দিলেন এবং জামাতে নামাজ আদায় করলেন স্বামী রোমান মোল্যা (৬০)। তবে সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দেওয়ার যেন তাড়াহুড়ো ছিল তাঁরও; নামাজ শেষ হতেই মসজিদের ভেতরে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি। মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে এই দম্পতির এমন করুণ ও মর্মান্তিক মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের মালিডাঙ্গা গ্রামে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মালিডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রোমান মোল্যার সহধর্মিণী দীর্ঘ সাত বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইসড) ছিলেন। মাঝে কিছুদিন শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেও অধিকাংশ সময়ই তিনি শয্যাশায়ী থাকতেন। গত শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটার দিকে নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
মৃত রোমান মোল্যা স্থানীয় মালিডাঙ্গা দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের একজন নিয়মিত ও দায়িত্বশীল মোয়াজ্জিন ছিলেন। সহধর্মিণীর আকস্মিক মৃত্যুর গভীর শোক ও কষ্ট বুকের ভেতর চেপে রেখে তিনি যথারীতি ফজরের আজানের সময় মসজিদে যান। সুমধুর কণ্ঠে আজান দিয়ে মুসল্লিদের সাথে জামাতে নামাজও আদায় করেন। তবে নামাজ শেষ হতে না হতেই তিনি হঠাৎ তীব্র শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করেন। সেখানে উপস্থিত মুসল্লিরা তৎক্ষণাৎ তাঁকে সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করার চেষ্টা চালান, কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
গত রোববার জোহরের নামাজের পর স্থানীয় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এই স্বামী-স্ত্রীর জানাজা একই সাথে সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রবাসে থাকা একমাত্র ছেলের শেষবারের মতো মা-বাবাকে দেখার অপেক্ষায় মরদেহ দুটি সাময়িকভাবে রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল বাশার জানান, এই দম্পতির ছেলে জসিম দীর্ঘদিন ধরে জীবিকার তাগিদে কুয়েতে অবস্থান করছেন। বাবা ও মায়ের একসঙ্গেই চিরবিদায়ের খবর পেয়ে তিনি অঝোরে কেঁদে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। কুয়েতপ্রবাসী ছেলে বাড়িতে পৌঁছানোর পর পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের দাফন সম্পন্ন করা হবে।
মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে চিরদিনের জন্য চলে যাওয়া এই স্বামী-স্ত্রীর প্রয়াণে পরিবার, পরম আত্মীয়স্বজন এবং পুরো গ্রামজুড়ে এক ভারী শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হৃদয়বিদারক ও অলৌকিক এই ঘটনাটি স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সর্বস্তরের মানুষকে চরমভাবে আবেগপ্লুত ও ব্যথিত করেছে।

