বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে মহাকাশ বিজ্ঞান ও গবেষণায় সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও রহস্যময় বিষয় হিসেবে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। বিশেষ করে ১৯১৬ সালে বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে ব্ল্যাকহোলের প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দেন।
মহাকাশ গবেষণায় “Black Hole” শব্দটি ১৯৬৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন পদার্থ বিজ্ঞানী জন হুইলার। তবে ব্ল্যাকহোল নিয়ে বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিকভাবে বিশদ গবেষণা করে গেলেও বাস্তবে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দ্বারা প্রথম নিশ্চিতভাবে ব্ল্যাকহোল শনাক্ত হয় ১৯৭১ সালে।
বিজ্ঞানীরা তাদের প্রথম আবিষ্কৃত ব্ল্যাকহোলের নাম দেন সিগনাস এক্স-১ (Cygnus X-1), যা পৃথিবী থেকে আনুমানিক ৬–৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে সিগনাস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীদের মতে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই হয়ত প্রায় ১০০ মিলিয়নের বেশি কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল লুকিয়ে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক গবেষণা ও উচ্চ প্রযুক্তির টেলিস্কোপের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের ভেতর মহাকর্ষ এতটাই শক্তিশালী হয় যে, এখানে স্থান-কাল এমনভাবে উল্টেপাল্টে যায় যে, আলোও পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পারে না।
২০২২ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে লুকিয়ে থাকা একটি সুপ্ত ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করেন। নাম দেওয়া হয় Gaia BH1। এটি ওফিউকাস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এবং পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব হতে পারে মাত্র প্রায় ১,৫৬০ আলোকবর্ষ (৪৭৮ পারসেক)।
অত্যন্ত রহস্যময় এই নিষ্ক্রিয় বা সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়ে থাকা ব্ল্যাকহোলের ভর হতে পারে সূর্যের প্রায় ১০ গুণ বা (≈9.62 M☉)। এটি একটি অনেকটাই আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রকে ১৮৫.৬ দিনে প্রদক্ষিণ করছে। গবেষণা অনুযায়ী, এই সঙ্গী হোস্ট নক্ষত্রের ভর সূর্যের প্রায় ৯৩% এবং ব্যাসার্ধ প্রায় ৯৯% হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অনুযায়ী, Gaia BH1 কোনো আলো বা বিকিরণ নির্গত করে না। ফলে এটিকে সরাসরি দেখার কোনো সুযোগ নেই, বরং সঙ্গী নক্ষত্রের গতিপথে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে এর অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে এই ব্ল্যাকহোলটি একেবারে সুপ্ত বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকায় কোনো বস্তু ধ্বংস বা গ্রাস করছে না, তাই পৃথিবীর জন্য কোনো রকম বিপদজনক নয়। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এবং কর্মকাণ্ড জানার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA)-এর Gaia Space Telescope এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির টেলিস্কোপের ডেটা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই নতুন ব্ল্যাকহোলটি আবিষ্কার করেন। তারা মনে করেন, আমাদের গ্যালাক্সিতে Gaia BH1-এর মতো আরও অনেক সুপ্ত ব্ল্যাকহোল লুকিয়ে থাকতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, Gaia BH1 প্রমাণ করে যে, ব্ল্যাকহোল শুধু ছায়াপথের কেন্দ্রে নয়, বরং গ্যালাক্সির বিভিন্ন স্থানে নীরবে লুকিয়ে থাকতে পারে। এটি মহাবিশ্বের অদৃশ্য গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে

