প্রধান খবর

রোববার শেষ হচ্ছে যুদ্ধবিরতি, ট্রাম্পের আল্টিমেটামে নতুন মোড়

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে আবারও যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে সাময়িক স্থিতাবস্থা বিরাজ করছিল, তা এখন খাদের কিনারায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী, আগামী রোববার (২৬ এপ্রিল) শেষ হচ্ছে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ। এই আল্টিমেটামকে কেন্দ্র করে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ ও উত্তেজনা

ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘কান’-এর বরাত দিয়ে মিডলইস্ট আই জানিয়েছে, ওয়াশিংটন স্পষ্ট ভাষায় তেল আবিবকে জানিয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা লক্ষ্যহীন আলোচনায় সময় ব্যয় করতে আগ্রহী নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত একটি ‘দ্রুত ও কার্যকর’ সমঝোতা চান। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্পের এই মারমুখী মনোভাবের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা অথবা চূড়ান্ত কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপের পথ প্রশস্ত করা। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সপ্তাহান্তের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কোনো নাটকীয় সাফল্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসা বার্তাগুলোতে এক ধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে রোববারের আল্টিমেটাম নিয়ে খবর চাউর হয়েছে, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট কিছুটা নরম সুর বজায় রেখে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ দিতেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। লেভিটের মতে, তেহরানের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ‘চূড়ান্ত’ করা হয়নি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের এই দুইমুখী অবস্থান আসলে ইরানের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। একদিকে আলোচনার সুযোগ রাখা, অন্যদিকে সময়সীমার খাঁড়া ঝুলিয়ে রাখা-এই দ্বিমুখী নীতি তেহরানকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হতে পারে।

রোববারের সময়সীমা নিয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে। মার্কিন প্রশাসনের অন্দরে ভিন্ন ভিন্ন সুরের কারণে তেল আবিব নিশ্চিত হতে পারছে না যে, রোববারের পর হোয়াইট হাউস সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না। ইসরায়েলি সূত্রগুলো মনে করছে, যদি রোববারের মধ্যে ইরান কোনো গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

ইরান বরাবরই বলে আসছে যে তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তেহরান সহজে চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করছে, ট্রাম্পের এই আল্টিমেটাম আসলে এক ধরনের ‘কূটনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’। তবে রোববারের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, তেহরানের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ ততই বাড়ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সমঝোতা আর সংঘাতের মাঝে দূরত্ব খুবই সামান্য। যদি রোববার কোনো সমাধান না আসে, তবে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। ট্রাম্পের এই সরাসরি ও কঠোর পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সমীকরণকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, নাকি সামরিক পদক্ষেপের সবুজ সংকেত দেবে-তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

সব মিলিয়ে, আগামী রোববার কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী কয়েক বছরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক সন্ধিক্ষণ। বিশ্ববাসীর নজর এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের দিকে; সবাই অপেক্ষা করছে রোববারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যা নির্ধারণ করবে শান্তি নাকি নতুন কোনো বিধ্বংসী সংঘাত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *