বর্তমানে বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে প্রভাবশালী দেশগুলোর সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ২.৬৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭% বেশি ছিল। আর চলতি ২০২৬ সালে তা হয়তো প্রায় ২.৮–৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় সামরিক সুপার পাওয়ার দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২০২৭ সালের জন্য প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল আকারের সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা হচ্ছে কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ পরিমাণে ব্যয় বৃদ্ধি। যদিও এই সামরিক ব্যয় বিল পাশে দেশটির কংগ্রেস ও সিনেটের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
এই বিশাল আকারের বাজেটের আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ মজুত, পরমাণু অস্ত্র আধুনিকায়ন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও হাইপারসনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে দেশটির প্রশাসন। এর পাশাপাশি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৭৫০-৮০০টি বৈদেশিক সামরিক ঘাটি ও স্থাপনা সুরক্ষা ও আধুনিকায়নে অর্থ ব্যয় করা হবে।
এদিকে, এক আমেরিকার পর বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানীয় সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়কারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে চীন। সিনহুয়া নিউজের দেয়া তথ্যমতে, চীন চলতি ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ( প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলার) সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বা বাজেট অনুমোদন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭% বেশি ছিল।
তবে, একাধিক অন্তর্জাতিক সামরিক থিংক ট্যাংকের মতে, বর্তমানে চীনের মোট সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৩৪৯ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া, রাশিয়া একই সময়ে প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলারের বড় আকারের এক প্রতিরক্ষা বাজেট নির্ধারণ করেছে, যা কিনা সোভিয়েত যুগের পর সর্বোচ্চ ছিল।
ভারত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে ৭.৮৫ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ দিয়েছে। এর পাশাপাশি চলতি ২০২৬ সালের জন্য ইউরোপে অন্যতম দেশের মধ্যে জার্মানি প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্য ৮৩ বিলিয়ন, ফ্রান্স ৬৬ বিলিয়ন, এবং জাপান প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নির্ধারণ করেছে।
হতাশাজনক হলেও সত্য যে, চলতি ২০২৬ সালে সৌদি আরবের একাই এই খাতে প্রায় ৮০-৯০ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারে। যদিও বাস্তবে তা হয়তো আরও বেশি হতে পারে। এছাড়া, একই সময়ে তুরস্ক ৫১.৪ বিলিয়ন ডলার, ইসরাইল ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার এবং ইরান আনুমানিক ২০-২২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নির্ধারণ করে।
২০২৬ সালের আপডেট তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার, কাতার ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার, কুয়েত প্রায় ৮-৯ বিলিয়ন ডলার এবং ওমান প্রায় ৮.২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নির্ধারণ করেছে। যদিও বাস্তবে এই ব্যয়ের পরিমাণ ও আকার হয়তো আরও বেশি হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনা ও ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য শুধু অস্ত্র প্রতিযোগিতা নয়, বরং ইতিবাচক কূটনৈতিক সংলাপ, নিজেদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই সবচেয়ে কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।

