ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পুণ্যময় আনুষ্ঠানিকতা ‘উকুফে আরাফা’ বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো হজের মূল পর্ব। জিলহজ মাসের নবম দিন অর্থাৎ গত মঙ্গলবার (২৬ মে) মহান আল্লাহর দরবারে আত্মনিবেদনের লক্ষ্যে বিশ্বের ১৬ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ ও সৌভাগ্যবান মুসলিম পুণ্যার্থী ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। এই মহাসমাবেশ শেষে আজ বুধবার (২৭ মে) সৌদি আরবসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।
মঙ্গলবার ভোর থেকেই ধবধবে সাদা ইহরাম পরিহিত লাখো হাজির কণ্ঠ নিঃসৃত ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির) ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে আরাফাতের প্রান্তর। ইসলামের শরিয়ত অনুযায়ী, জিলহজের ৯ তারিখে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান রুকন বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরা নির্ধারিত সীমানার মধ্যে অবস্থান করে চোখের জলে নিজেদের পাপমোচনে ব্যাকুল হয়ে কান্নাকাটি, তওবা-ইস্তিগফার, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আসকারের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মশগুল থাকেন।
দুপুরে আরাফাতের ঐতিহাসিক নামিরা মসজিদ থেকে বিশ্ব মুসলিমের উদ্দেশে হজের খুতবা প্রদান করেন মসজিদুল হারামের সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ আলি আল হুদাইফি। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এবার বাংলাসহ বিশ্বের মোট ৩৫টি ভাষায় এই দিকনির্দেশনামূলক খুতবাটি সরাসরি অনুবাদ করে বিশ্বজুড়ে সম্প্রচার করা হয়। খুতবায় শায়খ আলি আল হুদাইফি বলেন, “ইসলামি শরিয়ত ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম উম্মাহর সুদৃঢ় ঐক্যই বর্তমান বৈশ্বিক
বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।” একই সঙ্গে তিনি বিশ্বজুড়ে টেকসই শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখার জন্য বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও মুসলিম সমাজের প্রতি জোর আহ্বান জানান।
খুতবা ও নামাজ শেষে সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত ময়দান ছেড়ে মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে তারা একই সাথে কসর ও জমা করে মাগরিব এবং এশার নামাজ আদায় করেন। গত রাতটি হাজিরা মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে যাপন করেছেন এবং আজ মিনায় শয়তানকে নিক্ষেপ করার জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করেছেন।
আজ বুধবার (১০ জিলহজ) সকালে মিনায় জামারায় (বড় শয়তানকে) পাথর নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে ঈদুল আজহার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এরপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইব্রাহিমী সুন্নাত অনুসরণের লক্ষ্যে পশু কোরবানি করবেন হাজিরা। কোরবানি সম্পন্ন করার পর পুরুষ হাজিরা মাথার চুল ছেঁটে বা মুণ্ডন করে ইহরাম ভঙ্গ করবেন এবং চূড়ান্তভাবে কাবা শরিফ তাওয়াফ (তাওয়াফে জিয়ারাহ) ও সাফা-মারওয়া সাঈ করার মাধ্যমে হজের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন।
এদিকে, ১৬ লক্ষাধিক হাজির এই বিশাল ও সংবেদনশীল মিলনমেলা নিরাপদ, নির্বিঘ্ন এবং সুশৃঙ্খল করতে সৌদি আরব সরকার নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরমের হাত থেকে হাজিদের স্বস্তি দিতে বিভিন্ন পয়েন্টে স্বয়ংক্রিয় পানির ফোয়ারা ও বিশেষ ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

