প্রধান খবর

বৈশ্বিক অর্থনীতির রূপান্তর: চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন পথচলা

১৯৮০ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের ওপর তার অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে বিমান নির্মাণ ও অস্ত্র উৎপাদন বাদ দিলে বিশ্ব ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

তবে এখানে এটা বলা জরুরি যে, এই বিশ্ব অর্থনীতির নতুন এই পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের কোনো পতন নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রাকৃতিক বিবর্তন ও দক্ষতাভিত্তিক পুনর্বিন্যাসের ফল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র আজও ভেনেজুয়েলা ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তার ও ডলারের আধিপত্যের মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে। এছাড়া, সিলিকন ভ্যালি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও অ্যারোস্পেস প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী, যা দেশটিকে পরিষ্কারভাবে উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, হেভি শিপবিল্ডিং, অটোমোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা বিশ্ব থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ধীরে ধীরে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত ও জাপানের হাতে চলে গেছে। বর্তমানে চীনকে বলা হয় ‘গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’।
বর্তমানে চীন বৈশ্বিক পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১৮-২০ শতাংশ এবং গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাপ্লাই চেইনের ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ

একাই নিয়ন্ত্রণ করে। এই সক্ষমতা চীনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, শিল্পনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ফসল হিসেবে দেখা হয়।
তবে, এটা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের উপর টিকে রয়েছে। এই সুবিধার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনন্য এক অবস্থান ভোগ করে আসছে।
ট্রেডিং ইকনমিক্স ওয়েবসাইটের দেয়া তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নমিনাল জিডিপির আকার প্রায় ২৯.১৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে লাগামহীন অর্থব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশকিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১২২ থেকে ১২৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যেখানে, একই সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের বৈদেশিক ঋন ও দেনার পরিমাণ প্রায় ২.৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে।
আর এদিকে শুধু ঋণের সুদ বাবদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ অর্থবছরে অর্থ ব্যয় হয়েছে হয়তো প্রায় ১ থেকে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত বহির্বিশ্বে স্থানান্তরিত হওয়ায় দেশটি বর্তমানে ভোগ ও আর্থিক খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এখানে একটি বাস্তবসম্মত সতর্কতা হলো—যদি কোনো কারণে অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের প্রভাব হ্রাস পায় বা এর পতন ঘটে, তবে দেশটির বড় কর্পোরেশনগুলো ভেঙে পড়তে ৩-৪ বছরের বেশি সময় লাগবে না। এটি কোনো নেতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি যৌক্তিক বিশ্লেষণ।
তবে এটাও সত্যি যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে টিকে রয়েছে। আর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন, এবং উভয় দেশেরই নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা রয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্ববাসী খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতি হবে বহুমেরুকেন্দ্রিক, যেখানে বিশ্বের প্রভাবশালী ও উদীয়মান প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব কৌশল ও সক্ষমতা অনুযায়ী টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

লেখা : সিরাজুর রহমান

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *