সাহারা মরুভূমির চরম প্রতিকূল ও দুর্গম এলাকায় ট্রাক বিকল হয়ে তীব্র দাবদাহ এবং তীব্র পানিশূন্যতায় অন্তত ৫০ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নাইজারের উত্তরাঞ্চলীয় আগাদেজ মরুভূমি এলাকায় এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। মরুভূমির তপ্ত বালু ও জলহীন প্রান্তরে আটকে পড়ে তারা প্রাণ হারান। তবে এই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন মাত্র দুজন যাত্রী।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ২৪-এর এক প্রতিবেদনে এই হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়, গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) নাইজারের আগাদেজ অঞ্চলের গভর্নর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নিহত ব্যক্তিরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র মালি থেকে একটি মুসলিম ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিয়ে নিজ দেশে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে নাইজার ও আলজেরিয়া সীমান্তের আসামাকা শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে মরুভূমির ভেতরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের বহনকারী ট্রাকটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ে।
গভর্নর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, মাঝ-মরুভূমিতে গাড়িটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর চালক, তার সহকারী এবং আরোহীরা মিলে আপ্রাণ চেষ্টা করেও সেটি মেরামত করতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে তাদের সাথে থাকা মজুত পানি সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যায়। সাহারা মরুভূমির তীব্র তাপমাত্রা এবং আশেপাশে কোনো পানির উৎস বা লোকালয় না থাকায়, ওই বৈরী পরিবেশের মধ্যে যাত্রীরা সম্পূর্ণরূপে আটকা পড়েন। কোনো ধরনের সাহায্য ছাড়াই চরম উত্তাপের মধ্যে সেখানে দিনের পর দিন অবস্থান করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় এবং একে একে ৫০ জন যাত্রী পানিশূন্যতায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরবর্তীতে প্রশাসনের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ উদ্ধার করে মরুভূমির বুকেই গণকবর দেয়।
ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডি থেকে কোনো রকমে বেঁচে ফেরা দুই ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশাসন জানিয়েছে, জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা প্রচণ্ড সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তারা মরুভূমির চরম উত্তাপের মধ্যে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। মাইলের পর মাইল তপ্ত বালু পেরিয়ে প্রথমে তারা একটি পানির উৎসের সন্ধান পান এবং প্রাণরক্ষা করেন। পরে সেখান থেকে আরও হেঁটে আসামাকা শহরে পৌঁছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে পুরো বিষয়টি খুলে বললে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা বিশ্ববাসী জানতে পারে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপে যাওয়ার জন্য অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয় সাহারা মরুভূমির এই দুর্গম অঞ্চলটি। আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রগুলো প্রায়শই এই বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসে। প্রচণ্ড দাবদাহ, আকস্মিক ধূলিঝড় এবং পর্যাপ্ত খাবার ও পানির অভাবে প্রায়শই এই দুর্গম মরুভূমিতে অভিবাসী ও সাধারণ যাত্রীদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে মরুভূমি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থার চরম ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।

