চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত মনিরের দোষ স্বীকার

চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া এলাকায় সাড়ে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি মনির হোসেন (৩০) আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের একটি আদালত আসামির এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সাথে ঘটনার সংবেদনশীলতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে জমা দেওয়ার জন্য তদন্তকারী সংস্থাকে তাগিদ দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া জবানবন্দির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। গ্রেপ্তারকৃত মনির হোসেনের স্থায়ী বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার ঘারঘাটা গ্রামে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও মামলার নথি থেকে জানা গেছে, বাকলিয়া চেয়ারম্যানঘাটার বালুরমাঠ সংলগ্ন ‘ভাই ভাই ডেকোরেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পাশের গুদামে সাড়ে তিন বছরের ওই শিশুটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্ত মনির ওই ডেকোরেশন দোকানেরই একজন কর্মচারী। ঘটনার পর শিশুটিকে সেখান থেকে রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ সময় স্থানীয় জনতা অভিযুক্ত মনিরকে হাতেনাতে আটকে রেখে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করেন। খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আসামিকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এই ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) দিবাগত গভীর রাতে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় বাকলিয়া থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে শিশু নির্যাতনের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাকলিয়াজুড়ে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। উত্তেজিত হাজারো জনতা অভিযুক্ত মনিরকে আটকে রাখা ভবনটি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পুলিশ আসামিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যেতে চাইলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বাধা দেন এবং পুলিশের হাত থেকে আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে গণপিটুনি দেওয়ার চেষ্টা চালান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ ও উত্তেজিত জনতার মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়, যা বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত দেড়টা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এ সময় বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন, পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন এবং বেশ কিছু সাধারণ যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। রাত ১১টার পর ওই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পুলিশ বিশেষ কৌশলে আসামিকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে জনতার নজর এড়িয়ে অক্ষত অবস্থায় বের করে নিয়ে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সহিংসতায় ৩০-৩৫ জন পুলিশ সদস্য এবং সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ সহ ২০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

সিএমপির উপ-কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া জানিয়েছেন, পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা, সরকারি কাজে গুরুতর বাধা সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করার অপরাধে জড়িতদের চিহ্নিত করে বাকলিয়া থানায় আরও একটি পৃথক মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এদিকে, পাশবিক নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী শিশুটি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নিবিড় চিকিৎসাধীন রয়েছে। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন শিশুটির শারীরিক অবস্থার আপডেট দিয়ে জানিয়েছেন, শিশুটি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত রয়েছে। চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এটি ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ বলে মনে হলেও, শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য শিশুটির শরীর থেকে প্রয়োজনীয় আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ টেস্টের জন্য ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পেলেই প্রকৃত বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *