স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বিষয় বারবার প্রমাণিত হয়েছে ব্যক্তির চেয়ে প্রতীকই অধিক শক্তিশালী। সত্তরের নির্বাচনে যেমন প্রতীক মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান বাহক হয়ে উঠেছিল, আজও সেই বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান যদি জনপ্রিয় হন এবং তার দলের প্রতীকও যদি জনমানসে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে নির্বাচনী সমীকরণে তা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই পুরোনো বাস্তবতা নতুন করে দৃশ্যমান। দুটি বড় জোট একদিকে বিএনপি-সমর্থিত জোট, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ১০ দলীয় জোট মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে প্রতীক-নির্ভর রাজনীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বহুমতের রাজনীতিতে বহুদলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
নির্বাচনের মাঠে রয়েছে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ নানা মতাদর্শের দল। প্রতিটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি যেমন গণতান্ত্রিক বহুমতের প্রতিফলন, তেমনি বিভিন্ন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান নির্বাচনী ফলাফলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
রাজনীতির আদর্শিক অবস্থানকে বিসর্জন দিয়ে কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার লক্ষ্যে অনেক নেতা হঠাৎ জোটবদল করছেন যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে এবং রাজনীতির প্রতি আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে জোট ত্যাগ করে এককভাবে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ।
ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে দলীয় আদর্শ পরাজিত
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের পর উদীয়মান ছাত্রনেতা নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ থেকে বের হয়ে রাশেদ খানের বিএনপিতে যোগ দেওয়া, কিংবা এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদের দলত্যাগ এসব ঘটনা দেখায় যে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক সময় দলীয় আদর্শকে ছাপিয়ে যায়।
আরও এক ধাপ এগিয়ে ববি হাজ্জাজ নিজের গড়া এনডিএম দলকে কার্যত উপড়ে ফেলে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। একইভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করা এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শুভ বার্তা নয়।
অতীতে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, শমসের মুবিন চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরসহ আরও অনেকের দলত্যাগী রাজনীতি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করেছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটাররা ‘ফ্যাক্টর’
একটি বিষয় স্পষ্ট আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও তাদের সমর্থিত ভোটাররা এখনো বড় ফ্যাক্টর। বিভিন্ন দল নিজেদেরকে আওয়ামী সমর্থকদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে, যেন তাদের ভোটব্যাংককে আকৃষ্ট করা যায়।
অন্যদিকে বিএনপির প্রায় ৯০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা দলীয় প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপির মূলনীতি “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়” এই আদর্শে বিশ্বাসী নেতাদেরই যখন ব্যক্তিস্বার্থে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করতে দেখা যায়, তখন তা দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক।
অতীতের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের দায়
২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনসহ অতীতের নানা অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সিদ্ধান্তে ঐক্য না থাকলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া দুর্বল হয়। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন দলীয় শৃঙ্খলা, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
জনগণের সামনে কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
এখন সিদ্ধান্ত জনগণের হাতে। ব্যক্তি নয়, দল নয় তাদের অতীত ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিই হবে ভোটের মূল বিবেচ্য বিষয়।
যে দল বা নেতৃত্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে পারে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে পারে এবং রাষ্ট্রকে নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে জনগণ শেষ পর্যন্ত তাকেই বেছে নেবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, স্থিতি ও অগ্রগতি সেই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

