সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানেই থাকবে: মোজতবা খামেনি

পশ্চিমা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের মাটিতে উৎপাদিত ও সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়ামের কোনো মজুত দেশের বাইরে পাঠানো হবে না। গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) ইরানের দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওয়াশিংটনের সাথে চলমান শান্তি আলোচনায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে স্থানান্তর করার বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত বা বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তেহরানের এই নতুন ও কঠোর অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি বড় ধরনের ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোজতবা খামেনির এই সরাসরি নির্দেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে তীব্র হতাশায় ফেলতে পারে। এর ফলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনা আরও জটিল ও অনিশ্চিত রূপ নিল। এর আগে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গিয়েছিল যে, ট্রাম্প প্রশাসন তেল আবিবকে আশ্বস্ত করেছিল—ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যেকোনো সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির মূল শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা মিত্ররা অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, তেহরান ইতিমধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সীমানা ছাড়িয়ে প্রায় সামরিক বা অস্ত্র তৈরির পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে ইরান শুরু থেকেই এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে দাবি করছে।

এদিকে ইরানের এই অনড় অবস্থানের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান যতক্ষণ না তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরাবে, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আর্থিক ও সামরিক সমর্থন বন্ধ করবে এবং তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করবে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই সংঘাত ও সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম মজুত দেশে রাখার বিষয়ে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি দৃঢ় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, ইউরেনিয়াম বাইরে পাঠিয়ে দিলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। অবশ্য এই সংবেদনশীল বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াইট হাউস কিংবা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

তবে এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক আলোচনার একটি ক্ষীণ জানালা এখনো খোলা রয়েছে। জানা গেছে, প্রতিবেশী পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি নতুন খসড়া প্রস্তাব ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ইরান সংকট নিরসনে একটি ১৪ দফা প্রস্তাব পেশ করেছিল। ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপের মুখেও আলোচনার পথ খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, ইরান সবসময় যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে প্রস্তুত, তবে কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ বা বলপ্রয়োগের কাছে তেহরান মাথা নত করবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *