রাজধানীর মিরপুরে নিজ ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচাগলা ও পোকাখাদক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের মুখে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবশেষে কঠোর পদক্ষেপ নিল প্রশাসন। নিহতের বড় ছেলে এবং সরকারের যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান কর্মস্থল থেকে জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
আজ বুধবার (৩ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি দাপ্তরিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আদেশ জারি করা হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে, যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান আগামী ৪ জুনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল (মোংলা বন্দর) হতে বাধ্যতামূলকভাবে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত নতুন কর্মস্থলে (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) যোগদান করবেন। যদি তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ বা অবমুক্ত না হন, তবে ৪ জুন অপরাহ্ণে বর্তমান কর্মস্থল হতে তিনি তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (Stand Released) বলে গণ্য হবেন।
এর আগে, গত রবিবার (৩১ মে) রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচাগলা ও পোকায় খাওয়া অবহেলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই রোমহর্ষকঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পর থেকে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। বিশেষ করে, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাতে যখন জানা যায় যে আইনি ঝামেলা এড়াতে এই উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা শুরুতে নিজের মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন, তখন তাঁর নৈতিকতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র ও স্থানীয় প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত নুরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে চরম একাকী ও মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। এমনকি একই বাসায় পাশাপাশি দুটি কক্ষে তাঁর স্কুলশিক্ষক মেয়ে বসবাস করলেও, মায়ের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি রহস্যজনকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানাননি।
প্রতিবেশীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নুরজাহান বেগমের দুই ছেলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত হলেও তাঁরা মায়ের কোনো খোঁজখবর নিতেন না এবং দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। নিহত নুরজাহান বেগমের এক ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান সরকারের যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। অন্যদিকে তাঁর মেজো ছেলে এ কে এম আশিকুর রহমান দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন নামকরা অধ্যাপক।
উচ্চপদস্থ সন্তানদের এমন চরম সামাজিক ও নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে সরকারের এই দ্রুত ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপকে সচেতন মহল সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে এই ঘটনায় পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী আরও কোনো বিভাগীয় বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে কি না, তা জানতে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখছেন সবাই।

