একটি আধুনিক, মানবিক ও বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইউরোপের শান্তিপ্রিয় দেশ ফিনল্যান্ড আজ বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই সাফল্যের পেছনে তাদের শিক্ষানীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় দিক হলো যে, শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ও পুষ্টিকর দুপুরের খাবার নিশ্চিত করা।
ফিনল্যান্ডে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক (Upper Secondary) পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুপুরের খাবার সরবরাহ করা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি কোনো সাম্প্রতিক বা পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়; বরং ১৯৪৮ সাল থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিকল্পিতভাবে এই বিনামূল্যে স্কুল মিল (Mid-day Meal) ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা আজও সফলভাবে কার্যকর রয়েছে।
এই মিড-ডে-মিল বা দুপুরের খাবারের শতভাগ ব্যয় ফিনল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে বহন করে। দেশটিতে স্কুলে বিনামূল্যে খাবার সরবরাহকে কেবল একটি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে শিক্ষাক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যান্টিনে নামমাত্র মূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়। যেখানে সাধারণ কোনো রেস্তোরাঁয় একটি খাবারের মূল্য প্রায় ১০ ইউরো হতে পারে, সেখানে সরকারি ভর্তুকির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনে একই মানের খাবার শিক্ষার্থীরা মাত্র প্রায় ২.৫ থেকে ৩ ইউরোর মধ্যে পেয়ে থাকেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে খাবার সরবরাহ করা হলেও এর মান, পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যসম্মত দিকের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হয় না। ফিনল্যান্ডে জাতীয় পুষ্টি নির্দেশিকা অনুসরণ করে খাবারের মেনু নির্ধারণ করা হয়, যা একদিকে শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
ফিনল্যান্ডে এই ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
(১) শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
(২) পুষ্টিহীনতা দূর করা।
(৩) পারিবারিক আর্থসামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান ও বৈষম্যহীন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা।
আসলে, ফিনল্যান্ডের সরকার ও সাধারণ জনগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, শিক্ষা ও পুষ্টি একে অপরের পরিপূরক। এ কারণেই শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার নিশ্চিত করাকে তারা একটি শক্তিশালী, মানবিক ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
ফিনল্যান্ডের এই দীর্ঘদিনের সফল অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে স্বল্প আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য ও অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে। যদিও, বর্তমানে বিশ্বের অনেক স্বল্প আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে শিশুদের জন্য পরিকল্পিতভাবে মিড-ডে-মিল নিশ্চিত করা হয়েছে।

