যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা এসপিআর) দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই জরুরি মজুত ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে তেলের দাম ও সরবরাহ-উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। গত ২৮ মে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ গুহায় সংরক্ষিত ‘এসপিআর’ হলো বিশ্বের বৃহত্তম জরুরি অপরিশোধিত তেলের ভান্ডার। সাধারণত যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা সরবরাহ লাইনে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিলে এই মজুত ব্যবহার করা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র রেকর্ড পরিমাণ তেল ছেড়েছিল, যার ফলে মজুত ৬৩ কোটি ব্যারেল থেকে কমে ৩৫ কোটির নিচে নেমে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনও এসপিআর থেকে ব্যাপক হারে তেল ছাড়ছে। অথচ, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই রাজনৈতিক ফায়দার জন্য জাতীয় তেলভান্ডার খালি করার বিষয়ে বাইডেন প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ইরান-সংকট শুরুর পর থেকে মার্কিন জরুরি মজুত আরও প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল কমে বর্তমানে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর প্রধান তেল বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ জানান, এপ্রিল ও মে মাসে এসপিআর থেকে উত্তোলিত তেলের প্রায় অর্ধেকই বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো এখন মার্কিন তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ম্যাট স্মিথের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করছে।
তবে শুধু জরুরি মজুতই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেলভান্ডারও দ্রুত খালি হচ্ছে। ওকলাহোমার কুশিং কেন্দ্রে, যেখান থেকে ডব্লিউটিআই (WTI) তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারিত হয়, সেখানে গত সাত সপ্তাহে মজুত প্রায় ৮৫ লাখ ব্যারেল কমে ২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যক্রম সচল রাখার সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে সংরক্ষণ ট্যাংকগুলোর মজুত বিপজ্জনক স্তরে নেমে যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আশায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করছে।
এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে ওয়াশিংটন তেল রপ্তানিতে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে বলে গুঞ্জন থাকলেও হোয়াইট হাউস তা অস্বীকার করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত তেল সরবরাহের সক্ষমতা হারায়, তবে আগামী দিনে বিশ্ববাজারের দেশগুলো অপরিশোধিত তেলের তীব্র সংকটে পড়তে পারে।

