মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টানা দুই আসরের একচ্ছত্র আধিপত্য ও দাপট ভেঙে এবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। ভারতের গোয়ার ঐতিহাসিক জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘বি’ গ্রুপের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে স্বাগতিকদের কাছে ৩-০ গোলে পরাস্ত হয়েছে লাল-সবুজের দল। এই হারের ফলে দীর্ঘ ৭ বছর পর ভারতের বিপক্ষে পরাজয়ের তেতো স্বাদ আস্বাদন করতে হলো বাংলাদেশকে। তবে এই বড় বিপর্যয়ের পরও গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে কোচ পিটার বাটলারের শিষ্যরা। আগামী ৩ জুন ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে শক্তিশালী নেপালের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ‘এ’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ভারত শেষ চারে লড়বে ভুটানের বিপক্ষে।
ম্যাচটি ছিল মূলত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই। মালদ্বীপকে হারিয়ে আগেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা দুই পরাশক্তি এদিন মাঠে নেমেছিল মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লক্ষ্যে। ম্যাচের বয়স যখন মাত্র দেড় মিনিট, ঠিক তখনই এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েছিল বাংলাদেশ। ভারতীয় ডিফেন্ডার সিলকি দেবীর মারাত্মক ভুলের সুবাদে বল কেড়ে নিয়ে গোলরক্ষককে একেবারে একা পেয়ে যান বাংলাদেশের ফরোয়ার্ড আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। কিন্তু ওয়ান-টু-ওয়ান পজিশনে তার নেওয়া দুর্বল শটটি সরাসরি ভারতীয় গোলরক্ষকের গ্লাভসে জমা হলে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ। শুরুর এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়ার ধাক্কা পুরো ম্যাচেই দলের ওপর একটি নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে।
মাঠের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের দুটি চিরন্তন দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে-আক্রমণভাগের চরম ফিনিশিংয়ের অভাব এবং রক্ষণভাগের দায়িত্বজ্ঞানহীন অসতর্কতা। ভারতের তিনটি গোলই এসেছে বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের উপহার দেওয়া ভুলের সুযোগ নিয়ে।
ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে ডিফেন্ডার কোহাতি কিসকুর ভুল ক্লিয়ারেন্সের প্রথম খেসারত দেয় বাংলাদেশ। একটি সাধারণ দূরপাল্লার ক্রস হেডের সাহায্যে বিপদমুক্ত করতে গিয়ে তিনি বল তুলে দেন পেছনে সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকা ভারতীয় ফরোয়ার্ড পেয়ারি সাসার পায়ে। এমন সহজ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনাকুনি শটে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারকে পরাস্ত করে স্বাগতিকদের ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন পেয়ারি।
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ যখন গোল শোধে মরিয়া, ঠিক ৭৮তম মিনিটে রক্ষণভাগের অনভিজ্ঞতা ম্যাচ থেকে দলকে পুরোপুরি ছিটকে দেয়। বক্সের ভেতর ভারতের মালবিকাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ করে বসেন ডিফেন্ডার সুরমা জান্নাত। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দিলে ভারতের বদলি ফরোয়ার্ড লিন্ডা কম স্পট কিক থেকে ব্যবধান ২-০ করেন। এরপর ম্যাচের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিটে) ডান প্রান্ত থেকে আসা একটি ক্রস বক্সে ফাঁকায় পেয়ে যান মালবিকা। তাকে মার্ক করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন কোহাতি। ফলে সহজেই বল জালে জড়ান মালবিকা (৩-০)। ২০১৯ সাফের পর ভারতের কাছে এটিই বাংলাদেশের প্রথম পরাজয়।
কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের মধ্যমাঠে ও উইংয়ের সঙ্গে স্ট্রাইকিং জোনের সমন্বয়ের বড় অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। মারিয়া মান্দা, ঋতুপর্ণা চাকমা কিংবা শামসুন্নাহার জুনিয়ররা উইং দিয়ে গতিময় ফুটবল খেলে বেশ কয়েকবার বল বক্সে পাঠালেও, সেখানে পজিশন নেওয়ার মতো কোনো কার্যকারী ফরোয়ার্ড উপস্থিত ছিলেন না। মালদ্বীপকে ৪-২ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও ডিফেন্সের যে দুর্বলতা দৃশ্যমান ছিল, ভারতের বিপক্ষে তা আরও বড় ক্ষত হিসেবে সামনে এসেছে। সেমিফাইনালে নেপালের জমাট ফুটবলের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোচ পিটার বাটলারকে তাই রক্ষণের এই বড় ফাটলগুলো দ্রুত মেরামত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

