মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ও গোপনীয় অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শুরুর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) রক্ষায় ইসরায়েল তার সর্বাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ ব্যাটারি এবং এটি পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত সেনা দল পাঠিয়েছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ গত রবিবার (২৬ এপ্রিল) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
অ্যাক্সিওস-এর তথ্যমতে, এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশে আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের নজিরবিহীন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে আমিরাতের আকাশসীমা অরক্ষিত হয়ে পড়লে দেশটির প্রেসিডেন্ট সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আইডিএফ-কে (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) দ্রুততম সময়ে একটি আয়রন ডোম ব্যাটারি আমিরাতে পাঠানোর নির্দেশ দেন নেতানিয়াহু।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান আমিরাতকে লক্ষ্য করে প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং ২ হাজার ২০০-এর বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমিরাতকে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু করেছে তেহরান। যদিও এর বেশিরভাগই আকাশপথে ধ্বংস করা হয়েছে, তবে কিছু হামলা বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এই সংকটকালীন সময়ে ইসরায়েলি সহায়তা আমিরাতের জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করেছে। একজন জ্যেষ্ঠ আমিরাতি কর্মকর্তা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, “কঠিন সময়ে পাওয়া এই সহায়তার কথা আমরা কোনোদিন ভুলব না।”
২০২০ সালে ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা শান্তি চুক্তির পর গাজা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মাঝে মাঝে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলেও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই দেয়নি, বরং আমিরাতে আঘাত হানার আগেই দক্ষিণ ইরানে মোতায়েন করা স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করতে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী একাধিকবার প্রি-এম্পটিভ (পূর্বপ্রস্তুতিমূলক) হামলা চালিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক কর্মকর্তা তারেক আল-ওতাইবা এক নিবন্ধে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে প্রকৃত মিত্র হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।”
ইসরায়েলের ত্রিস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই ‘আয়রন ডোম’। অ্যারো সিস্টেম (দূরপাল্লা) এবং ডেভিডস স্লিং (মাঝারি পাল্লা)-এর পরিপূরক হিসেবে আয়রন ডোম স্বল্প পাল্লার রকেট ও ড্রোন মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্নও উঠেছে। গত বছরের জুনে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আয়রন ডোমের কিছু সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে, যা ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছিল। তা সত্ত্বেও, আমিরাতের আকাশে কয়েক ডজন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করে এই সিস্টেমটি তার উপযোগিতা আবারও প্রমাণ করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের এই গোপন সামরিক সহযোগিতা কেবল একটি যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ নয়, বরং এটি ইরান-বিরোধী একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ব্লকের আনুষ্ঠানিক যাত্রার ইঙ্গিত।

