আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতি ও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার বাজারে ‘মানসিক চাপ’ এখন এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কাজের অসহনীয় চাপ এবং অনুন্নত কর্মপরিবেশের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ৮ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রের এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল প্রাণহানিই ঘটাচ্ছে না, বরং পঙ্গুত্ব ও দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার কারণে প্রতিবছর মানবসভ্যতা থেকে ৪.৫ কোটি ‘সুস্থ জীবন বছর’ (Healthy Life Years) হারিয়ে যাচ্ছে।
আইএলও এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ গবেষণা ও গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংখ্যাটি নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষকরা পাঁচটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকিকে এই মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:
• অত্যধিক কর্মঘণ্টা: দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীন কাজ।
• চাকরির অনিশ্চয়তা: চাকরি হারানোর স্থায়ী আতঙ্ক।
• অসম বণ্টন: কঠোর পরিশ্রমের বিপরীতে নগণ্য পুরস্কার বা মূল্যায়ন।
• কর্তৃত্বের অভাব: কাজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ না থাকা।
• নিপীড়ন ও হয়রানি: কর্মস্থলে সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতনদের দ্বারা লাঞ্ছনা।
এই কারণগুলো সরাসরি হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং মারাত্মক বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রের এই মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং একটি বড় অর্থনৈতিক সংকটও। কর্মীদের অসুস্থতা, অনুপস্থিতি এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ফলে প্রতিবছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১.৩৭ শতাংশ জিডিপি (GDP) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যখন একজন দক্ষ কর্মী অকালে প্রাণ হারান বা পঙ্গুত্ব বরণ করেন, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
আইএলও কর্মপরিবেশকে তিনটি প্রধান মানদণ্ডে ভাগ করে দেখিয়েছে কেন পরিবর্তন জরুরি:
১. কাজের প্রকৃতি: দক্ষতা অনুযায়ী কাজ এবং পর্যাপ্ত উপকরণের প্রাপ্যতা।
২. ব্যবস্থাপনা: স্বচ্ছ দায়িত্ব বণ্টন এবং কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক নীতি: হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর নিয়ম এবং কাজের সময়ের নমনীয়তা।
আইএলও কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমান যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যাপক ব্যবহার কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন এনেছে। যদি এই রূপান্তর সঠিকভাবে সামলানো না যায়, তবে আগের মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”
মানসিক চাপ কেবল মনের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শরীরে বিপাকীয় সমস্যা (ডায়াবেটিস), পেশী ও হাড়ের ব্যথা এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার সৃষ্টি করে। আইএলও-র উপসংহারে বলা হয়েছে, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই ‘সক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ গ্রহণ করতে হবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং রিমোট ওয়ার্কিং বা বাসা থেকে কাজের ব্যবস্থা একদিকে যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের সীমারেখা মুছে দিয়ে চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা এখন আর কেবল পরোপকার নয়, বরং টেকসই ব্যবসার অন্যতম প্রধান শর্ত।

