প্রধান খবর

ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্ত করল তুরস্ক!

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৫ মার্চ বুধবার যুক্তরাজ্য এবং তুরস্ক একটি মাল্টি-বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ২০টি ইউরোফাইটার টাইফুন (ইএফ-২০০০) মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান রপ্তানির চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও জোরদার করবে। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশ দুটির মধ্যে ৮ বিলিয়ন পাউন্ড (১০.৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের প্রাথমিক চুক্তি হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চুক্তির অধীনে ব্রিটেনের শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান—বিএই সিস্টেমস, লিওনার্দো ইউকে, এমবিডিএ, রোলস-রয়েস এবং মার্টিন-বেকার—বিমানের ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশ, এভিওনিক্স সিস্টেম, অস্ত্র, ইজেকশন সিট ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। এতে এই খাতে যুক্তরাজ্যে ১৮ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বর্তমান চুক্তির আওতায় তুর্কি পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রুদের জন্য যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এদিকে, তুরস্ক এখন তাদের প্রথম ব্যাচের ব্রিটিশ নির্মিত এই যুদ্ধবিমান প্রাপ্তি এবং পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাছাড়া, দেশটি কাতার ও ওমানের কাছ থেকে পুরোনো এই জাতীয় যুদ্ধবিমান সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তুরস্ক মূলত ৪++ প্রজন্মের ইউরোফাইটার টাইফুনের একেবারে আপগ্রেড সংস্করণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ প্যাকেজসহ ক্রয় করতে যাচ্ছে। বর্তমানে তুরস্ক কমব্যাট ড্রোন, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং মিসাইল প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও দেশটির বিমানবাহিনীর এয়ার কমব্যাট ফ্লিট সক্ষমতা মোটেও আধুনিক নয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালে জার্মানি তুরস্কের কাছে এই যুদ্ধবিমান রপ্তানি বা হস্তান্তরে ভেটো প্রদান করেছিল। তাই, বর্তমান চুক্তি বাস্তবায়নে জার্মানির ভূমিকা এখনো একটি বড় প্রশ্নবিদ্ধ ইস্যু হয়ে রয়ে গেছে। যুক্তরাজ্য এই চুক্তি এগিয়ে নিয়ে গেলেও ইউরোপের অন্যান্য অংশীদার দেশের সম্মতি ছাড়া পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়তো কঠিন হতে পারে।

বর্তমানে, তুরস্কের বিমান বাহিনীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পুরোনো ২৪০টির কাছাকাছি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন (ব্লক-৩০/৪০) এবং প্রায় ৪৮টি এফ-৪ ফ্যান্টম-২ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এগুলোই বর্তমানে তাদের প্রধান এয়ার কমব্যাট ফ্লিট। তবে কয়েক বছর থেকেই তুরস্ক আমেরিকার কাছ থেকে নতুন ৪০টি এফ-১৬ ব্লক-৭০/৭২ যুদ্ধবিমান ক্রয় এবং ৮০টি যুদ্ধবিমানের আধুনিকায়ন কিট সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

অথচ, গ্রিসের সাথে তুরস্কের বৈরী সম্পর্কের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিসের ২৫৪টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের মধ্যে অধিকাংশ যুদ্ধবিমানকে অত্যাধুনিক ব্লক-৭০/৭২ পর্যায়ে আপগ্রেড করে দিচ্ছে। পাশাপাশি, নতুন চুক্তির আলোকে গ্রিস প্রাথমিকভাবে ২০টি এফ-৩৫এ স্টেলথ ফাইটার জেট পেতে যাচ্ছে, যা তুরস্কের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই) ২০২১ সালের নভেম্বরে নতুন প্রজন্মের টিএফ-এক্স প্রজেক্টের (কেএএএন) প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি সম্পন্ন করে। দেশটি এখনও পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি প্রোটোটাইপ তৈরি করলেও এই যুদ্ধবিমানের পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন কার্যক্রম আগামী ২০২৮-২৯ সালের আগে হয়তো চালু করতে পারবে না।

এছাড়া, টিএফ-এক্স (কেএএএন) যুদ্ধবিমানের নিজস্ব ইঞ্জিন, এভিওনিক্স প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকায় তুরস্ককে নিশ্চিতভাবেই এই প্রজেক্টের সফলতা পেতে হয়তো আরও কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাই, এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে উদ্ভূত ঘাটতি পূরণ করতেই এবার যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে খুব দ্রুত ২০টি ইউরোফাইটার টাইফুন সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক।

২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের কারণে তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার জেট প্রজেক্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর আগে তুরস্ক ওই প্রকল্পে বহু বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল। সেই অভিজ্ঞতা তুরস্ককে পশ্চিমা অস্ত্রশিল্পের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে চরম শিক্ষা দিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের পুরোনো যুদ্ধবিমান ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় তুরস্ক এবার তাদের বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে এখন শুধু গ্রিস কিংবা ইসরাইল নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটেও তুর্কি সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

লেখা: সিরাজুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *