বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সিজিপিএ মাত্র ৩.১৫, আর নামের পাশে রয়েছে ৫টি ‘ব্যাকলগ’। এমন একাডেমিক রেকর্ড সাধারণত যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই হতাশার কারণ হতে পারে। তবে এই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়ে অসামান্য এক সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের সদ্য স্নাতক নাহিদুজ্জামান। স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা থেকে সরাসরি ‘ফুল ফান্ডেড’ পিএইচডির অফার পেয়েছেন তিনি।
জামালপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম দিলালেরপাড়া থেকে উঠে আসা নাহিদুজ্জামান এখন আন্তর্জাতিক গবেষণা, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিজের এক অনন্য পরিচিতি তৈরি করেছেন। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর গবেষণার প্রতি অদম্য কৌতূহল থাকলে যে কোনো বাধাই যে পথ আটকাতে পারে না, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই তরুণ।
নাহিদুজ্জামানের গবেষণার পথচলা শুরু হয় ২০২৩ সালে। তিনি তখন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলামের গবেষণাগারে যুক্ত হয়ে শুরুতে ব্রুসেলোসিস ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করেন। পরবর্তীতে জনস্বাস্থ্য, খাদ্যবাহিত রোগজীবাণু এবং এপিডেমিওলজি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণায় মনোনিবেশ করেন তিনি।
২০২৫ সালে বিশ্বখ্যাত ‘পিএলওএস ওয়ান’ (PLOS ONE) জার্নালে প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল গবেষণায় লিড রিসার্চার (প্রধান গবেষক) হিসেবে কাজ করেছেন নাহিদুজ্জামান, যা একজন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত বিরল একটি অর্জন। ড. আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেশের রাস্তার পাশে বিক্রি হওয়া ফলের স্বাস্থ্যগত প্রভাব, তাতে থাকা ব্যাকটেরিয়ার ধরন ও পরিমাণ এবং মানুষের পরিপাকতন্ত্রের লক্ষণের সঙ্গে ব্যাকটেরিয়াল লোডের সম্পর্ক নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
নিজের কাজ প্রসঙ্গে নাহিদুজ্জামান বলেন, “আমি সব সময় বাস্তব সমস্যাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছি। রাস্তার পাশের খাবার বা ফল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা খুবই জরুরি। এই তাগিদ থেকেই জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যবাহিত রোগজীবাণু নিয়ে কাজ শুরু করি।”
মাঠপর্যায়ের গবেষণার পাশাপাশি জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিকসেও সমানভাবে কাজ করেছেন এই তরুণ। বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুনের তত্ত্বাবধানে তিনি ব্রয়লার মুরগির মাংস থেকে শনাক্ত হওয়া ‘স্ট্যাফাইলোকক্কাস হিমোলাইটিকাস’ ব্যাকটেরিয়ার পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশে খাদ্য উপাদানে এই জীবাণুর উপস্থিতির প্রথম নথিভুক্ত প্রমাণ এটি। এছাড়াও তিনি একাধিক জীবাণুর জিনোম সিকোয়েন্স বৈশ্বিক জিন ডাটাবেস ‘এনসিবিআই’ (NCBI)-তে উন্মুক্ত করেছেন।
গবেষণার বাইরে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়েও রয়েছে নাহিদুজ্জামানের দারুণ দক্ষতা। একজন ‘এথিক্যাল হ্যাকার’ হিসেবে পরিচিত এই গবেষক বর্তমানে গবেষকদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ ও জিনোমিক কাজ সহজ করতে ‘ইজি-স্ট্যাট-এন’ এবং ‘কিউআই-জেনেক্স-এন’ নামে দুটি সফটওয়্যার টুল তৈরি করছেন, যার একটি পরীক্ষামূলক ওয়েব সংস্করণ ইতোমধ্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
তার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “বিজ্ঞানের যেকোনো জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধান করার অনন্য সক্ষমতা তার রয়েছে। আমি তার মধ্যে ভবিষ্যতের একজন দক্ষ ও সম্ভাবনাময় বিজ্ঞানীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। নাহিদের সুপারভাইজার হতে পেরে আমি গর্বিত।”
সাধারণত মাস্টার্স ছাড়া সরাসরি ফুল ফান্ডেড পিএইচডি অফার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়। তবে নিরলস পরিশ্রম আর গবেষণার প্রতি একাগ্রতার কারণেই এই অসাধ্য সাধন করেছেন নাহিদ।
তবে শুধু বিদেশে পাড়ি জমানোই তার শেষ লক্ষ্য নয়। পিএইচডি শেষ করে তিনি দেশেই ফিরে আসতে চান। বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজি ও এপিডেমিওলজি ভিত্তিক একটি উদ্ভাবনী ল্যাব গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেন তার গবেষণা দেশের জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে।
নাহিদুজ্জামানের এই সাফল্য প্রমাণ করে, একাডেমিক সিজিপিএ বা ব্যাকলগ কখনোই সফলতার শেষ কথা হতে পারে না। পরিশ্রম ও লেগে থাকার মানসিকতা থাকলে যেকোনো কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে বড় স্বপ্নের দেখা পাওয়া সম্ভব।

