বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর ক্রমবর্ধমান মানবিক চাহিদা পূরণ এবং তীব্র তহবিল সংকট মোকাবিলায় ২০ লাখ ইউরো (প্রায় ২৬ কোটি টাকা) আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ফিনল্যান্ড। জীবনরক্ষাকারী জরুরি সেবা নিশ্চিতকরণ ও শরণার্থীদের সার্বিক সুরক্ষা কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে এই অর্থ সরাসরি ব্যয় করা হবে। রোববার (৩১ মে) জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফিনল্যান্ড সরকারের এই মানবিক সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, বৈশ্বিক এই অনুদান বর্তমানের বড় ধরনের তহবিল ঘাটতি লাঘব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি এই অর্থায়নের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচিতে, যা তাদের স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করবে।
মিয়ানমারে পদ্ধতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন। স্থানীয়ভাবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এসব পরিবারের সিংহভাগই সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ইউএনএইচসিআর-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে মাত্র ২৩ শতাংশ রোহিঙ্গা পরিবার ‘কাজের বিনিময়ে অর্থ’ কর্মসূচির আওতায় সামান্য আয়ের সুযোগ পেয়েছিল। বাকিদের মধ্যে ৪২ শতাংশ পরিবার অত্যন্ত অস্থায়ী ও অনিশ্চিত আয়ের উৎসের ওপর জীবন ধারণ করছে এবং ৩৫ শতাংশ পরিবারের কোনো ধরনের আয়ের উৎসই ছিল না। দাতা দেশগুলোর তহবিল কমে যাওয়ায় শিবিরের নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী, বয়োবৃদ্ধ এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে অনুপ্রবেশ করা প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন ফিনল্যান্ডের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হ্রাস পাওয়ার এই কঠিন সময়ে, যখন শিবিরের আইন-শৃঙ্খলা ও জীবনযাত্রার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, তখন ফিনল্যান্ডের এই বাড়তি সহায়তা এক অনন্য উদারতার পরিচয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, মিয়ানমারে যতক্ষণ পর্যন্ত স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হচ্ছে, ততক্ষণ এই অসহায় মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ফিনল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মারি আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “ফিনল্যান্ড শুরু থেকেই বাংলাদেশ ও মজলুম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে রয়েছে। মৌলিক সহায়তার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থীদের ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ সংকটের প্রতি বিশ্বনেতাদের মনোযোগ ধরে রাখাও জরুরি।”
উল্লেখ্য, গত ২০ মে রোহিঙ্গা মানবিক সংকট মোকাবিলায় ‘২০২৬ সালের হালনাগাদ যৌথ সাড়া পরিকল্পনা’ (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান-জেআরপি) প্রকাশের পর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে অর্থায়নের তাগিদ দেয়। সেই আহ্বানের অব্যবহিত পরেই ফিনল্যান্ডের এই অর্থ সহায়তা এলো।
সংশোধিত এই পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় বাংলাদেশী ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীসহ মোট ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে জরুরি সহায়তা দিতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের তুলনায় এবার বাজেটের পরিমাণ ২৬ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা কেবল অতি জরুরি জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ। বর্তমানে মোট চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কাজ করা ফিনল্যান্ড কেবল রোহিঙ্গা সংকটেই নয়, বরং ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মানবিক সংকট মোকাবিলায় ইউএনএইচসিআর-কে আরও ৭০ লাখ ইউরো অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের টেকসই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে জাতিসংঘ।

