মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খনি ও পাথর কোয়ারির কাজের জন্য মজুত রাখা একটি গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে শিশুসহ অন্তত ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। চীন সীমান্তসংলগ্ন শান রাজ্যে ঘটা এই আকস্মিক ও শক্তিশালী দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক মানুষ।
স্থানীয় সময় রোববার (৩১ মে) দুপুর ১২টার দিকে মিয়ানমারের নামখাম জনপদের কাউংটুপ গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী বিপর্যয় ঘটে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি-সহ মিয়ানমারের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, খনির কাজে ব্যবহৃত বিস্ফোরকের অনিয়ন্ত্রিত মজুত থেকেই এই দুর্ঘটনার সূত্রপাত।
দুর্ঘটনাকবলিত কাউংটুপ গ্রামটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত, যা চীন সীমান্ত থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার (২ মাইল) দক্ষিণে । অঞ্চলটি বর্তমানে দেশটির সামরিক জান্তা সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’র (টিএনএলএ) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, আশপাশের শতাধিক ঘরবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে চারদিকে কেবল ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং ধসে পড়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখা গেছে।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উদ্ধারকর্মী জানান, “বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আমরা এখনও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৬ শিশুসহ ৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্তত ৭৪ জনকে আহত অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।” অপরদিকে, শান রাজ্যের স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘শওয়ে ফি মায়ায়’-সহ বেশ কিছু মিডিয়া নিহতের সংখ্যা ৫০ থেকে ৫৫ জন বলে দাবি করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি (CCTV) তাদের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, একটি আবাসিক ভবনে খনির বাণিজ্যিক কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক অবৈধ বা অরক্ষিত অবস্থায় মজুত করে রাখা হয়েছিল, যা কোনো কারণে সক্রিয় হয়ে এই বিস্ফোরণ ঘটায়।
বিস্ফোরণের পর বিদ্রোহী গোষ্ঠী টিএনএলএ তাদের নিজস্ব টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। তারা জানায়, খনি ও পাথর কোয়ারির কাজের জন্য সেখানে ‘জেলিগনাইট’ (Gelignite) নামের বিস্ফোরক মজুত রাখা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খনি ও পাথর ভাঙার কাজে বহুল ব্যবহৃত এই জেলিগনাইট দীর্ঘদিন ধরে সঠিক নিয়মে ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে তা চরম বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে সামান্য অসাবধানতা বা আবহাওয়ার তাপমাত্রার পরিবর্তনেই এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে।
ঠিক কী কারণে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণে থাকা টিএনএলএ। বর্তমানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জরুরি চিকিৎসা, ত্রাণ ও সাময়িক পুনর্বাসন সহায়তা দিচ্ছে।

