সাত মাস আগে ঘোষিত তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কাগজে-কলমে বিদ্যমান থাকলেও গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলা থামেনি। গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন প্রান্তে এবং পশ্চিম তীরের বসতিগুলোতে পৃথক অভিযানে নারী ও শিশুসহ অন্তত এক ডজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই সহিংসতা আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয় সূত্রমতে, উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই—আবদেলমালেক ও আবদেল সত্তার আল-আত্তার নিহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এলাকাটি তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চলের আওতায় থাকলেও অতর্কিত এই হামলা চালানো হয়। গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় ৯ বছর বয়সী শিশু সালেহ বাদাউই এবং খান ইউনিসে ৩৮ বছর বয়সী মোহসেন আল-দাব্বারি ইসরায়েলি গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
শুক্রবারও গাজার চিত্র ছিল রক্তক্ষয়ী। শুজাইয়া এলাকায় পানি বহন করার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে মোহাম্মদ ও ঈদ আবু ওয়ার্দা নামের দুই ভাই নিহত হন। একই এলাকায় একটি পানিশোধন স্থাপনায় ড্রোন হামলায় আরও এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের দাবি, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল অন্তত ২ হাজার ৪০০ বার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
জাতিসংঘের সংস্থা ‘ইউএন উইমেন’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু প্রাণ হারাচ্ছেন। সংস্থাটির মানবিক কার্যক্রম প্রধান সোফিয়া ক্যালটর্প জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজায় ৩৮ হাজারের বেশি নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছেন। চলমান এই সংঘাতকে ইতিহাসে নারী ও শিশুদের জন্য অন্যতম ভয়াবহ কালখণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের মোট সংখ্যা ৭২ হাজার ৩৪০ ছাড়িয়েছে।
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি অভিযান তীব্রতর হয়েছে। গত ভোরে ইয়াত্তার মাজদ আল-বাআ এলাকায় সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়েছে এবং ব্যক্তিগত যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। জেরুজালেমের উত্তর ও নাবলুস এলাকায় কোনো পরোয়ানা ছাড়াই কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যাডামির’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে ইসরায়েলের কারাগারে ৯ হাজার ৬০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন, যার মধ্যে ৩ শতাধিক শিশু ও ৮৪ জন নারী। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে ৩ হাজার ৫৩২ জনকে কোনো বিচার বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ‘প্রশাসনিক আটকাদেশে’ রাখা হয়েছে। গাজা জুড়ে বিরাজমান তীব্র খাদ্যসংকট এবং সুপেয় পানির অভাব পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক সামরিক কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

