নবায়নযোগ্য এনার্জি ও কৌশলগত জ্বালানি তেল সংরক্ষণে সারাবিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন!

বর্তমানে সারা বিশ্বকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় পথ দেখাচ্ছে চীন। দীর্ঘ মেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে নবায়নযোগ্য শক্তি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে দেশটি। একইসঙ্গে কৌশলগত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুতেও শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে চীন।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA) ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে চীনের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৮৯ টেরাওয়াট, যার মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশই আসে অ-জীবাশ্ম (নবায়নযোগ্য গ্রিন এনার্জি) উৎস থেকে।

একই সময়ে চীন সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ১.২ টেরাওয়াট, বায়ুশক্তি থেকে প্রায় ০.৬৪ টেরাওয়াট এবং জলবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ০.৪৫ টেরাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আর শুধু ২০২৫ সালেই চীন প্রায় ৪.৪ লাখ মেগাওয়াট নতুন সৌর ও বায়ুশক্তি সক্ষমতা যুক্ত করেছে।

আবার, কৌশলগত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুতের ক্ষেত্রেও চীন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও সরকারিভাবে কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয় না, তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অনুমান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে চীনের কৌশলগত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত ছিল প্রায় ১.২-১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল, যা দেশটির প্রায় ১০০ দিনের আমদানি চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হয়।

তবে, সেই তুলনায় একই সময়ে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক ও সামরিক সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ব্যারেল এবং জাপানের প্রায় ৩০০-৩২০ মিলিয়ন ব্যারেল। এছাড়া, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কৌশলগত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত ছিল প্রায় ৩৯-৪৫ মিলিয়ন ব্যারেল।

বর্তমানে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারতও নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তৃতীয় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ০.৫৫ টেরাওয়াটের বেশি হতে পারে। আর গত ২০২৫ সালের হিসেব অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১.২৫-১.৪ টেরাওয়াট।

তবে, হতাশাজনক হলেও সত্য যে, শুধু দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা এবং টেকসই বিনিয়োগের অভাবে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সাপ্লাই চেন স্বল্প মেয়াদে কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে স্বল্প আয়ের এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবার আগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে এই সমস্যা প্রবলভাবে বিশ্বের সামনে ফুটে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায়, চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুতের অগ্রগতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে, এই সাফল্য যেন কেবল বিশ্বের উন্নত ও ধনী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *