নাসা সম্প্রতি পৃথিবী থেকে প্রায় ১০০ আলোকবর্ষ দূরে ড্রাকো নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত TOI-1452 b নামক একটি এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে এটি একটি বিস্ময়কর সুপার-আর্থ, যার পৃষ্ঠ হয়তো সম্পূর্ণরূপে পানি দ্বারা আচ্ছাদিত থাকতে পারে।
প্রথমে নাসার TESS টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই গ্রহের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, এই এক্সোপ্ল্যানেটে বিপুল পরিমাণ পানি থাকতে পারে। ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কৃত এই গ্রহটি বর্তমানে আমাদের সৌরজগতের বাইরে অত্যন্ত রহস্যময় এক্সোপ্ল্যানেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
TOI-1452 b এক্সোপ্ল্যানেট বাইনারি স্টার সিস্টেমের একটি এম-টাইপ লাল বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। এর ভর পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৪.৮ গুণ এবং ব্যাসার্ধ ১.৬৭ গুণ বেশি। এই বিশাল আকার ও ভরের কারণে এটিকে সুপার-আর্থ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই গ্রহটি তার কেন্দ্রীয় নক্ষত্র থেকে মাত্র ০.০৬১ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক বা প্রায় ৯১ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আমাদের পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে যেখানে ৩৬৫ দিন সময় নেয়, সেখানে TOI-1452 b মাত্র ১১ দিনে তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করে। এর কক্ষপথ প্রায় বৃত্তাকার বলে ধারণা করা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, লাল বামন শ্রেণির নক্ষত্র সাধারণত সূর্যের তুলনায় যথেষ্ট শীতল হয়ে থাকে। যার ফলে এই গ্রহটি তার হোস্ট নক্ষত্রের অনেকটাই কাছাকাছি থাকলেও এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও পরিবেশ হয়তো তরল জল টিকে থাকার মতো উপযোগী হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে, এই গ্রহটির ভরের প্রায় ২২ শতাংশই পানি দ্বারা গঠিত হয়েছে, যা এটিকে একটি সম্ভাব্য সুবিশাল আকারের মহাসাগর গ্রহে পরিণত করেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই মহাসাগরের আনুমানিক গভীরতা হতে পারে হাজার কিলোমিটার। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রহটির গড় তাপমাত্রা প্রায় ৫৩° সেলসিয়াস হতে পারে। এ অবস্থায় পানির একটি বড় অংশ বাষ্পে পরিণত হয়ে ঘন জলীয় বায়ুমণ্ডল তৈরি করতে পারে। তাই সেখানে মহাসাগর থাকলেও তা জীবনের জন্য যথেষ্ট উপযোগী নাও হতে পারে।
তবুও TOI-1452 b সুপার আর্থ এক্সোপ্ল্যানেট আমাদের মহাবিশ্বে জটিল জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন ধারণা প্রদান করছে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ পানির উপস্থিতি এই এক্সোপ্ল্যানেটকে বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ভবিষ্যতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপসহ অন্যান্য শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে এর বায়ুমণ্ডল, পানির প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য জীবনের উপযোগী পরিবেশ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করবেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আর সব মিলিয়ে বর্তমানে TOI-1452 b হচ্ছে একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার, যা মহাবিশ্বে জটিল জীবনের রহস্য উন্মোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
লেখা: সিরাজুর রহমান

