বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাত, দীর্ঘ মেয়াদি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, এবং বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক উত্তেজনার মুখে রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বৈশ্বিক সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয়। এছাড়া, একইভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারাবিশ্বে প্রাণঘাতী অস্ত্র বাণিজ্য ও সরবরাহ অবিশ্বাস্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI), International Institute for Strategic Studies (IISS)-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৬৩ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা তার আগের বছরের তুলনায় ৭% বেশি। আর চলতি ২০২৬ সালে তা হয়ত প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গত ৩ মার্চ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও আল-জাজিরার নিউজের তথ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসন আগামী ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের (১৫০০ বিলিয়ন) সামরিক বাজেট প্রস্তাব করেছে। এটি চলতি ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা ব্যয় বা বাজেটের তুলনায় প্রায় ৪০%-এর বেশি হবে। যদিও এটি বাস্তবায়নে দেশটির কংগ্রেস ও সিনেটের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন এই সামরিক বাজেট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের একক অর্থবছরে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো, দেশটির সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদ মজুত বৃদ্ধি, পরমাণু অস্ত্র আধুনিকায়ন, ‘Golden Dome’ নামক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও হাইপারসনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
এদিকে, রয়টার্সের তথ্যমতে, গত ১০ মার্চ চীনের জাতীয় পার্লামেন্ট ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ১.৯৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (২৮২ বিলিয়ন ডলার) সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ৬.৯% বেশি। এই অর্থ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ আধুনিকায়ন, যৌথ যুদ্ধ পরিচালনা ব্যবস্থা, এবং উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্যয় করা হবে। এর পাশাপাশি চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২০২৬ সালের জন্য রাশিয়া রেকর্ড পরিমাণ সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন দিয়েছে, যা ছিল দেশটির মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার (১৩.৭ ট্রিলিয়ন রুবল)। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার এই সামরিক ব্যয় সোভিয়েত যুগের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে চলিত ২০২৬ সালে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হতে পারে মোট প্রায় ১৬.৮৪ ট্রিলিয়ন রুবল (প্রায় ২১৭ বিলিয়ন ডলার)।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার পর বর্তমানে ভারতকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ হিসেবে দেখা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়েছে ৭.৮৫ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ৮৫.৮ বিলিয়ন ডলার) , যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এর মধ্যে ২৫% (প্রায় ২১.৪ বিলিয়ন ডলার) নতুন যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও ড্রোন অন্যান্য ডিফেন্স সিস্টেম ক্রয় ও আধুনিকায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এখন ইউরোপের অধিকাংশ দেশ তাদের নিজস্ব সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করছে। বিভিন্ন সূত্রের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে জার্মানি। চলতি বছরে দেশটি প্রায় ১২৫.০২ বিলিয়ন ডলার সামরিক খাতে ব্যয় নির্ধারণ করেছে।
এছাড়া, জার্মানির পাশাপাশি একই সময়ে যুক্তরাজ্য প্রায় ৮৩.৪৪ বিলিয়ন ডলার, ফ্রান্স প্রায় ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার, তুরস্ক প্রায় ৫১.৪ বিলিয়ন ডলার এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় দেশ জাপান প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল আকারের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয়/বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে।
এসআইপিআরআই-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের মোট অস্ত্র বাণিজ্যের আনুমানিক ৪০-৪৫% চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা আমির শাসিত আরব দেশগুলোতে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব প্রায় ৭৪.৭৬ বিলিয়ন ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার, কাতার ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার, কুয়েত প্রায় ৮-৯ বিলিয়ন ডলার এবং ওমান প্রায় ৮.২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নির্ধারণ করেছে। যদিও বাস্তবে এই ব্যয় হয়তো আরও বেশি হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনা ও ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও ভারতসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো আজ নিজেদের সুরক্ষিত করতে হাইপারসনিক মিসাইল, ড্রোন, এআই এবং পরমাণু অস্ত্র সম্ভার গড়ে তুলতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে চায়।
তবে এটা ঠিক যে, দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য শুধু অস্ত্র প্রতিযোগিতা নয়, বরং ইতিবাচক কূটনৈতিক সংলাপ, নিজেদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই সবচেয়ে কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকে। তবে হতাশাজনক হলেও সত্য যে, বাস্তবে বর্তমান অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেই আশা যেন এক মরীচিকায় পরিণত হয়েছে।
লেখা: সিরাজুর রহমান

