সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আমেরিকার তৈরি বোয়িং ই-৪বি ‘নাইটওয়াচ’ এয়ারক্রাফট নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যাকে পশ্চিমা মিডিয়ায় প্রায়শই ‘ডুমসডে’ বা ‘কেয়ামতের বিমান’ নামে অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই উচ্চপ্রযুক্তির বিমানটির উপস্থিতি অনেকের মধ্যেই কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই বিমানটিকে ঘিরে প্রচলিত অনেক ধারণাই হতে পারে অতিরঞ্জিত বা আংশিক মিথ। মূলত, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী ১৯৮০-এর দশক থেকে একটি কৌশলগত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘এয়ারবর্ন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বোয়িং ৭৪৭-২০০ প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এয়ারবর্ন অপারেশনস সেন্টার (NAOC) হিসেবে কাজ করে।
আসলে, ১৯৭০-এর দশকে এর উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমান E-4B সংস্করণটি ১৯৮০-এর দশক থেকে কার্যকরভাবে ইউএস এয়ারফোর্স ব্যবহার করছে। এটি প্রথম আকাশে উড্ডয়ন করে ১৯৭৩ সালে। এতে উন্নত প্রযুক্তির যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট লিঙ্ক, এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধ প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে।
বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনীর কাছে এ ধরনের চারটি বিমান রয়েছে, যা সর্বদা প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়। প্রতিটি বিমানের পরিচালন ব্যয় (per-hour operating cost) প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১.৫ থেকে ২ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এই উচ্চ ব্যয় এবং সর্বক্ষণ প্রস্তুত অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ।
বোয়িং ই-৪বি ‘নাইটওয়াচ’ এয়ারক্রাফটের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন- পারমাণবিক সংঘাত বা বৃহৎ সামরিক সংকটের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সামরিক কমান্ডের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা। এ কারণেই বিমানটিকে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP) এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব সহ্য করার উপযোগী করে সুরক্ষিতভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয় যে এই বিমানটি একটানা সাত দিন আকাশে উড়তে সক্ষম। বাস্তবে, আকাশে জ্বালানি সরবরাহ (in-flight refueling) প্রযুক্তির কারণে দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার তাত্ত্বিক সক্ষমতা থাকলেও, ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা এবং ক্রুদের শারীরিক সক্ষমতার কারণে এত দীর্ঘ সময় টানা উড্ডয়ন সীমিত এবং বাস্তবে বিরল বলা চলে। উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী, এর টানা উড্ডয়নের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়তো প্রায় ৩০-৩৫ ঘণ্টার কাছাকাছি হতে পারে।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক হাইপারসনিক মিসাইল, উন্নত রাডার এবং সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যুগে কোনো বিমানকেই সম্পূর্ণ অজেয় বলা যায় না। তবে E-4B নাইটওয়াচকে এই বাস্তবতার মধ্যেই উচ্চ টিকে থাকার সক্ষমতা (survivability) বিবেচনায় ডিজাইন করা হয়েছে। এটি সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নয়; বরং সংকটময় পরিস্থিতিতে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সচল রাখার জন্য একটি সুরক্ষিত ও বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে এই বিমানটির সক্রিয় উপস্থিতি মূলত একটি কৌশলগত সতর্কতা ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি কোনো আসন্ন মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত নয়, বরং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি পরিকল্পিত ও নিয়মিত ব্যবস্থা। তাই ‘ডুমসডে বিমান’ বা ‘কেয়ামতের বিমান’ নামে অভিহিত করার পরিবর্তে, একে ‘উড়ন্ত ন্যাশনাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’ হিসেবে মূল্যায়ন করাই অধিক যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হবে।

