বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ কেবল সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের উপলক্ষ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে এবারের বৈশাখী বাণিজ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব। ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের মুনাফার আশা করলেও উচ্চমূল্য ও সাধারণ মানুষের সংকুচিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে বাজারের চিত্র ছিল মিশ্র।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এবং অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈশাখী অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পোশাক, খাবার, মিষ্টি এবং মৃৎশিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের এক বিশাল অংশ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তবে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা বিগত বছরগুলোর লোকসান কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি খুচরা বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন ভিন্নভাবে। তিনি জানান, যদিও উৎসবের কারণে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন ও বৈশাখী ভাতার মাধ্যমে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বাণিজ্যে যে ‘সুবাতাস’ প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
দেখা গেছে, বৈশাখের মূল আকর্ষণ পোশাক খাতে বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে লাল-সাদা পোশাকের চাহিদাকে কেন্দ্র করে আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট ও বেনারসি পল্লিতে ভিড় ছিল লক্ষণীয়। তবে ক্রেতাদের প্রধান অভিযোগ ছিল আকাশচুম্বী দাম নিয়ে। একই অবস্থা বিরাজ করছে ইলিশের বাজারেও। সরবরাহ সংকটে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ টাকা ছাড়িয়েছে, যা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য এখন বিলাসিতায় রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, করপোরেট সংস্কৃতি ও ‘হালখাতা’র প্রথা মিষ্টি শিল্পের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণ গ্রুপের তথ্যমতে, বৈশাখ উপলক্ষে মিষ্টির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। শুধু ‘মিঠাই’ ব্র্যান্ডই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০-৩৫ টন মিষ্টির অর্ডার পেয়েছে। এ ছাড়া ফুল, মাটির গয়না এবং মৃৎশিল্পের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে কিছু বাড়তি আয়ের মুখ দেখছেন।
সব মিলিয়ে, প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও বৈশাখী অর্থনীতি তার নিজস্ব গতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এ ধরনের উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যের পূর্ণ সুফল পাওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

