প্রধান খবর

মুম্বাইয়ে একই পরিবারের ৪ জনের মৃত্যু, নতুন রহস্য উদঘাটন

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের একটি অভিজাত এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যের আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিকভাবে ‘বিষাক্ত তরমুজ’ সেবনে মৃত্যুর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও, ময়নাতদন্তের চাঞ্চল্যকর তথ্য এই ঘটনাকে ভিন্ন এক মোড় দিয়েছে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি শুক্রবার (১ মে) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই মৃত্যুর পেছনে সাধারণ খাদ্য বিষক্রিয়া নয়, বরং অন্য কোনো গভীর রহস্য বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকতে পারে।

গত শনিবার রাতে মুম্বাইয়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ দোখাডিয়া (৪৫) তাঁর বাসভবনে আত্মীয়-স্বজনদের জন্য এক নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। পারিবারিক ওই অনুষ্ঠানে খাবারের তালিকায় ছিল মাটন পোলাও। উপস্থিত অতিথিদের ভাষ্যমতে, রাত পর্যন্ত সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা বিদায় নেওয়ার পর, রাত আনুমানিক ১টার দিকে আবদুল্লাহ, তাঁর স্ত্রী নাসরিন (৩৫) এবং দুই কিশোরী কন্যা জয়নাব ও আয়েশা মিলে তরমুজ খান।

বিপত্তির শুরু হয় ভোরের দিকে। ভোর ৫টা নাগাদ পরিবারের চার সদস্যই তীব্র বমি, ডায়রিয়া এবং অসহ্য পেটে ব্যথা নিয়ে ছটফট করতে থাকেন। দ্রুত তাঁদের নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চারজনেরই মৃত্যু হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই মৃত্যুর ধরন অত্যন্ত অস্বাভাবিক। সাধারণত পচা বা সংক্রামিত খাবার থেকে সৃষ্ট ‘ফুড পয়জনিং’-এর ক্ষেত্রে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যে ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়, এখানে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, মৃতদের মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র ও অন্ত্রসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে ‘সবুজাভ’ বর্ণ ধারণ করেছে। চিকিৎসকদের মতে, শুধুমাত্র ফল বা বাসি খাবার সেবনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এমন নাটকীয় পরিবর্তন হওয়া প্রায় অসম্ভব।

সবচেয়ে বড় চমকটি এসেছে ব্যবসায়ী আবদুল্লাহর মরদেহের টক্সিকোলজি রিপোর্টে। তাঁর শরীরে ‘মরফিন’-এর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মরফিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ, যা নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়া শরীরে প্রবেশ করলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। একজন সুস্থ সবল ব্যবসায়ীর শরীরে কেন এবং কীভাবে এই মাদক বা ওষুধটি প্রবেশ করল, তা এখন তদন্তকারীদের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

মুম্বাই পুলিশ বর্তমানে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে ঘটনার গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ বেশ কিছু দিক গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে:
১. খাবারের উৎস ও অতিথিদের বক্তব্য: ওই রাতে পরিবেশিত মাটন পোলাও যারা খেয়েছেন, সেই আত্মীয়রা সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। ফলে মূল খাবারে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। তদন্তকারীদের নজর এখন সেই ‘তরমুজ’ এবং রাতের শেষ ভাগে খাওয়া পানি বা পানীয়র দিকে।
২. রাসায়নিক মিশ্রণ: কোনো অসাধু চক্র বা পরিচিত কেউ খাবারে কৌশলে বিষাক্ত কোনো রাসায়নিক বা মরফিন মিশিয়ে দিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

৩. মানসিক ও আর্থিক চাপ: ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ কোনো বড় ধরনের আর্থিক লোকসান বা পারিবারিক মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন কি না, যা তাঁদের আত্মহননের মতো পথে ঠেলে দিতে পারে—সেই দিকটিও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ।

৪. ভিসেরা রিপোর্ট: চারজনের ভিসেরা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য স্টেট ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই রিপোর্টের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যাবে ঠিক কোন রাসায়নিকের কারণে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবুজ হয়ে গিয়েছিল।

রাজ্যের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) এই ঘটনার পর বাজার থেকে তরমুজের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত সাধারণ বাজারে বিক্রি হওয়া তরমুজের সাথে এই মৃত্যুর সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। এফডিএ কর্মকর্তারা জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

মুম্বাই পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, “আমরা ল্যাবরেটরি রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। মরফিনের উপস্থিতি আমাদের তদন্তকে নতুন দিকে মোড় নিতে বাধ্য করেছে। এটি কোনো দুর্ঘটনা, না কি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা শিগগিরই পরিষ্কার হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *