প্রধান খবর

বিএনপি সরকারের তিন মাস: সাফল্য-সমালোচনা পাশাপাশি

বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল, আজ থেকে সরকার চতুর্থ মাসে প্রবেশ করেছে। এই সময়ের মধ্যে দলটি নির্বাচনের আগে দেওয়া বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। মেয়েদের স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনা, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় সম্মানি, খাল খনন, কৃষিঋণ মওকুফ, হজের খরচ কমানোসহ শতাধিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তবে সমালোচনার জায়গাও কম নয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সড়কে চাঁদাবাজি, রাস্তায় হকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, মব সহিংসতা, প্রশাসনে বিতর্কিত নিয়োগ, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দূরত্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সামনে তাই শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনআস্থা ধরে রাখা।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সরকারের তিন মাসের পারফরম্যান্সকে “অভূতপূর্ব” বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান মনে করেন, সরকারের কর্মকাণ্ডে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে, যা কতদিন টিকবে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, জলাশয় খনন, ফুয়েল কার্ড, ধর্মীয় সম্মানি, জাকাত আধুনিকায়ন, প্রবাসী কার্ড, হজ খরচ কমানো, সরকারি শূন্যপদ পূরণ, পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল, বৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কিছু সিদ্ধান্ত যেমন গাড়িবহর কমানো, শনিবার অফিস করা, সচিবালয়ে সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সরকারি গাড়ির বদলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

তবে গুম প্রতিরোধবিষয়ক অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন না হওয়ায় মানবাধিকার মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে গুমের তদন্ত পুরোনো আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই চলবে। আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক সংস্থা আইসিজি সতর্ক করেছে, বিএনপি যদি অর্থবহ রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তবে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি সংসদের ভেতরে-বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে পারে।

দল-সরকার-সংসদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও শোনা যাচ্ছে। কোন নেতাকে কোন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবার কিছু মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা তিন স্তরের নেতৃত্ব থাকায় সমন্বয় জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে দলীয় মহলে আলোচনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় অসন্তোষও দেখা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, তিন মাসে সরকারের সাফল্য যেমন দৃশ্যমান, তেমনি সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট। সামনে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জনআস্থা ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *