গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ৫১ দিনব্যাপী এক যুদ্ধে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অর্ধশতাধিক টার্গেটে বেশ কয়েকটি নতুন মডেলের ব্যালেস্টিক মিসাইল ব্যবহার করেছে। এগুলোর মধ্যে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত একটি উচ্চগতির মিডিয়াম রেঞ্জের ব্যালেস্টিক মিসাইল হলো ১,৪৫০ কিলোমিটার রেঞ্জের খাইবার শেকান (Kheibar Shekan)।
সম্পূর্ণ সলিড ফুয়েল রকেট মোটরচালিত এই মিসাইলটি ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) কর্তৃক ডিজাইন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এটি মূলত একটি ম্যানুভারেবল সুপারসনিক গতির ব্যালেস্টিক মিসাইল, যার সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ৪ থেকে ম্যাক ৫-এর মধ্যে হতে পারে। আর সলিড ফুয়েলচালিত হওয়ায় এটিকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই নিক্ষেপ করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কিছু নিউজ মিডিয়া ইরানের তৈরি খাইবার শেকান ব্যালেস্টিক মিসাইলকে হাইপারসনিক বলে দাবি করলেও বাস্তবে এটি একটি উচ্চগতিসম্পন্ন সুপারসনিক ব্যালেস্টিক মিসাইল, যাকে প্রচলিত এবং শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ফাঁকি দেওয়ার উপযোগী করে ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে।
১১.৪ মিটার দৈর্ঘ্যের এই মিসাইলের সর্বোচ্চ পেলোড ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এটি একটি ম্যানুভারেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকেল (MaRV) প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা শেষ পর্যায়ে প্রয়োজনে নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তনে সক্ষম। ফলে প্যাট্রিয়ট, থ্যাড বা আয়রন ডোমের মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এটিকে নির্ভুলভাবে ইন্টারসেপ্ট করা বেশ কঠিন হয়ে যায়।
খাইবার শেকান ব্যালেস্টিক মিসাইলের নামকরণ করা হয়েছে মদিনার কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘খাইবার দুর্গ’-এর নামানুসারে, যা ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম বাহিনী বিজয় করেছিল। এটি প্রথম ২০২২ সালের দিকে বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে ইরানের IRGC বাহিনী। গত ২০২৫ সালের ২২ জুন ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলে ২০তম আক্রমণের সময় প্রথমবারের মতো এই মিসাইল বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোর পাশাপাশি আমেরিকার মোতায়েন করা অত্যন্ত শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে খাইবার শেকান নির্ভুলভাবে বেশ কিছু টার্গেটে আঘাত হেনে সারাবিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি, ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি ফাত্তাহ-২ মিসাইলকে একটি অত্যাধুনিক হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (HGV) মিসাইল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, টার্মিনাল ফেজে যার গতি আনুমানিক ম্যাক ১৩-১৫ পর্যন্ত হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বে হাইপারসনিক ও উচ্চগতির মিসাইল প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় চীন, রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারতের নাম বারবার আলোচিত হলেও ইরান কিন্তু বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে খাইবার শেকান কিংবা ফাত্তাহ-২-এর মতো বেশ কয়েকটি সিরিজের উচ্চগতির মিসাইল ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বের আধুনিক ও অতি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আজ একেবারে অপ্রতিরোধ্য নয়। এই বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কৌশলগত ভারসাম্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

